অবহেলিত নায়কেরা: ক্ষুদ্রঋণ কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকট ও করণীয়
- আপডেট সময় : ০৫:০৭:৫৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ মে ২০২৫ ২০২ বার পড়া হয়েছে
ড. মো: মাহিদ শেখ ,সাইকোলজিস্ট ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ: বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ কর্মীরা যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মুখোমুখি হন, তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশ তার গতিশীল ক্ষুদ্রঋণ খাতের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত, যা দারিদ্র্য বিমোচন এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে মাঠপর্যায়ে কাজ করা ক্ষুদ্রঋণ কর্মীদের নিরলস পরিশ্রম, যারা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করেন।
ক্ষুদ্রঋণ কর্মীদের ভূমিকা নিছক ঋণ বিতরণেই সীমাবদ্ধ নয়। তারা ঋণগ্রহীতাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে শিক্ষা দেন, ঋণ পরিশোধ নিশ্চিত করেন এবং একটি স্থিতিশীল আর্থিক সম্পর্ক বজায় রাখতে সহায়তা করেন। অনেকাংশে বলা যায়, ক্ষুদ্রঋণ ক্ষেত্রের সাফল্য এই কর্মীদের সততা ও শ্রমনির্ভর আচরণেই নিহিত।
তবে, এই কর্মীদের নানামুখী সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। তাঁদের কাজের সময় নির্ধারিত নয়, অনেক ক্ষেত্রেই দুপুরের খাবারও সময়মতো জোটে না। মাঠপর্যায়ের এক কর্মী জানান, “কাজ শেষ না করে শাখায় ফেরা যাবে না”—এমন নির্দেশ থাকে ব্যবস্থাপকের পক্ষ থেকে। ফলে প্রায়ই রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়, এমনকি রাতে কিস্তি সংগ্রহের জন্যও মাঠে থাকতে হয়। এতে করে তৈরি হয় শারীরিক ক্লান্তির পাশাপাশি মানসিক চাপ।
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নেতৃত্বের পরিবর্তে কর্তৃত্বপরায়ণ মনোভাব পোষণ করেন। তাঁরা সমস্যা সমাধানের চেয়ে পজিটিভ রিপোর্ট দেখাতেই বেশি আগ্রহী। এতে মাঠকর্মীরা নিজেদেরকে সমস্যার মোকাবেলায় একা ও অসহায় বোধ করেন। ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক অসুবিধা, স্বাস্থ্য সমস্যা বা পারিবারিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় মাঠকর্মীদেরকে অতিরিক্ত মানসিক শ্রম দিতে হয়, যা তাদের মানসিক সুস্থতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
২০১৮ সালের ১৭ জানুয়ারি পিকেএসএফ পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, ক্ষুদ্রঋণ কর্মীদের চাকরি ছাড়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে ছিল অনির্ধারিত কাজের চাপ, মানসিক অস্থিরতা এবং ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে খারাপ সম্পর্ক। বিষয়টি প্রমাণ করে যে, মানসিক স্বাস্থ্যের অবহেলা এই খাতের স্থায়িত্বের জন্য একটি বড় হুমকি।
অন্যান্য অনেক উন্নত দেশ যেমন কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ইতোমধ্যেই কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে আইন প্রণয়ন করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের শ্রম আইনে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি এখনও তেমনভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। অথচ একজন কর্মীর মানসিক সুস্থতা সরাসরি তার উৎপাদনশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
ক্ষুদ্রঋণ কর্মীদের জন্য একটি সহায়ক ও মানবিক কর্মপরিবেশ তৈরির জন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন: মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন, মেন্টাল হেলথ সাপোর্ট প্রোগ্রাম চালু, অফিস সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সংবেদনশীল নেতৃত্ব প্রদান সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া। এছাড়া, মানসিক স্বাস্থ্যের উপর খোলামেলা আলোচনা, বিরতি ও বিশ্রামের সুযোগ এবং কর্মচারী সহায়তা কর্মসূচি প্রবর্তন—এইসব উদ্যোগ মাঠকর্মীদের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে ও কর্মপ্রেরণা জোগাবে।
সবশেষে বলা যায়, ক্ষুদ্রঋণ কর্মীদের সামাজিক মর্যাদা এবং মানসিক সুস্থতাকে স্বীকৃতি দেওয়া না গেলে এই খাতের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা কঠিন হবে। তাই সময় এসেছে তাদের মানসিক সুস্থতা এবং কর্মপরিবেশকে গুরুত্ব দিয়ে নীতিনির্ধারকদের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার।
ড. মো: মাহিদ শেখ
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
dipu.mohid@gmail.com
মোবাইল : ০১৭৪৭৩৮৫১২৪




















