বিশেষজ্ঞদের মতে, কোটি কোটি বছর আগে প্রাচীন সমুদ্রাঞ্চলে জৈব পদার্থের স্তর জমে এবং পরবর্তীতে চাপ ও তাপের প্রভাবে তা পেট্রোলিয়ামে রূপ নেয়। এই প্রক্রিয়া এবং অনুকূল ভূতাত্ত্বিক গঠনের কারণে আজ মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বে তেলের অন্যতম বৃহৎ ভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে।
১৯০৮ সালে মধ্যপ্রাচ্যে প্রথমবারের মতো তেলের দেখা মেলে। তৎকালীন পারস্যের (বর্তমান ইরান) সুলাইমানি মসজিদ এলাকায় একটি তেলের খনি থেকে হঠাৎ তেল প্রায় ২৪ মিটার বা ৮০ ফুট উঁচুতে ছিটকে ওঠে। এর ফলে মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। তবে এই তেলের রাজনৈতিক গুরুত্ব একপাশে সরিয়ে রাখলে এর জন্ম ও উৎপত্তির পেছনে রয়েছে এক ভৌগোলিক কাহিনি।
পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেটগুলো নড়াচড়া করার সময় আফ্রিকান ও আরবীয় প্লেট যখন ইউরেশীয় প্লেটের সঙ্গে ধাক্কা খায়, তখন টেথিস সমুদ্রটি সংকুচিত হয়ে বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে সমুদ্রের তলদেশে থাকা বিপুল পরিমাণ মৃত প্রাণী ও উদ্ভিদ মাটির নিচে চাপা পড়ে। আজকের পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলটি মূলত সেই প্রাচীন সমুদ্রের ওপরেই অবস্থিত।
অনেকে মনে করেন, তেল মানেই মৃত ডাইনোসরের অংশ, কিন্তু আসলে তা নয়। লাখ লাখ বছর ধরে মাটির নিচে চাপা পড়া আণুবীক্ষণিক শৈবাল, প্ল্যাঙ্কটন ও সামুদ্রিক জীবের ওপর প্রচণ্ড তাপ ও চাপের ফলে এই তেল তৈরি হয়েছে। এই জীবগুলো সূর্য থেকে যে শক্তি সংগ্রহ করেছিল, তা দীর্ঘ সময়ের রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় তরল ও গ্যাসীয় হাইড্রোকার্বনে বা জ্বালানিতে রূপান্তরিত হয়েছে।
বর্তমানে বিশ্বের মোট তেল উৎপাদনের প্রায় ৩০ শতাংশ ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ১৭ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এর প্রধান কারণ হলো সৌদি আরব, ইরান ও ইরাকের মতো দেশগুলোর তেলের বিশাল ভান্ডার। তবে মজার ব্যাপার হলো, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেলের মজুত কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে নেই, সেটি আছে ভেনেজুয়েলায়। আবার সবচেয়ে বেশি তেল উৎপাদন করে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে শুধু তেল তৈরি হওয়াই নয়, তা সংরক্ষিত থাকার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের ভূগর্ভস্থ পাথরের স্তর এমনভাবে গঠিত যে তেল সহজে বাইরে বের হয়ে যেতে পারেনি। শক্ত আবরণ বা “ক্যাপ রক” তেলকে আটকে রেখেছে, ফলে বিশাল তেলক্ষেত্র গড়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, এই অঞ্চলে ভূমিকম্প বা বড় ধরনের ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তন তুলনামূলক কম হওয়ায় তেলের স্তর অক্ষত থেকেছে। একই সঙ্গে মরুভূমির বালুকাময় পরিবেশ উপরের স্তরকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করেছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা ও জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের তেলের উৎস মূলত প্রাচীন সামুদ্রিক জৈব পদার্থ এবং দীর্ঘমেয়াদি ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার ফল। সব গবেষণাই এই মৌলিক ব্যাখ্যায় একমত হলেও, তেল গঠনের নির্দিষ্ট সময়কাল বা স্তরের গভীরতা নিয়ে কিছু পার্থক্য দেখা যায়, যা গবেষণা পদ্ধতির ভিন্নতার কারণে হয়ে থাকে।
মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর বিশ্বের জ্বালানি বাজার অনেকটাই নির্ভরশীল। বাংলাদেশের মতো তেল আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এই অঞ্চল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ওঠানামা সরাসরি দেশের অর্থনীতি, পরিবহন ব্যয় ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব ফেলে। তাই মধ্যপ্রাচ্যের তেলের উৎপত্তি ও সরবরাহ পরিস্থিতি বোঝা অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
তেলের গুণাগুণের দিক থেকেও মধ্যপ্রাচ্য এগিয়ে আছে। ভেনেজুয়েলার মতো দেশগুলোয় প্রচুর তেল থাকলেও তা মাটির অনেক গভীরে ও বেশ ঘন ও আঠালো। এ ধরনের আঠালো তেল মাটির নিচ থেকে তোলা কঠিন ও তা রিফাইন করতে অনেক খরচ হয়। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের তেল অনেকটা হালকা ধরনের। এটি সহজে তোলা যায় ও প্রক্রিয়াজাত করাও সাশ্রয়ী। তাই বিশ্ববাজারে এই তেলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি।



















