ঢাকা ০৪:০০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
রাজশাহী নগরীতে ২০ এপ্রিল থেকে ১০ মে পর্যন্ত হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হবে: রাসিক প্রশাসক রাবিতে শহীদ হবিবুর রহমান ও সুখরঞ্জন সমাদ্দারের অন্তর্ধান দিবস পালিত মধ্যপ্রাচ্যে এতো তেল আসলো কোথা থেকে? জমি দখলের অভিযোগ অস্বীকার রাজশাহীর কৃষকদল নেতার ট্রাম্পকে সরাতে জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে কমিশন গঠনের প্রস্তাব পুলিশ গুলি করলে তায়িম মা মা বলে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে: ট্রাইব্যুনালে শহীদ তায়িমের বাবা ময়নাল হোসেন   রাজশাহীতে চিকিৎসকদের অতিরিক্ত ফি নিয়ন্ত্রণে ৬ দফা দাবিতে স্মারকলিপি বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন ইসলামী সভ্যতা বিরোধী রাজশাহীতে ঘুড়ি উৎসবে রাজনৈতিক নেতাদের মিলনমেলা ইরানের সঙ্গে পুনরায় আলোচনা শুরুর ঘোষণা ট্রাম্পের, বিশ্ববাজারে ডলারের দরপতন

পুলিশ গুলি করলে তায়িম মা মা বলে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে: ট্রাইব্যুনালে শহীদ তায়িমের বাবা ময়নাল হোসেন  

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৫০:৪৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে

জাতীয় ডেস্ক: জুলাই বিপ্লবে যাত্রাবাড়িতে শহীদ ইমাম হাসান তায়িম হত্যা মামলায় সপ্তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন তায়িমের বাবা পুলিশ কর্মকর্তা এসআই ময়নাল হোসেন। বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ জবানবন্দিতে তিনি বলেন, আমার ছেলে ইমাম হাসান তায়িম ভূইয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যাত্রাবাড়ি এলাকায় অংশগ্রহণ করেছিল। আমার জানা মতে সে ১৫-১৯ জুলাই ২০২৪ পর্যন্ত যাত্রাবাড়ি কাজলা এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল।

জবানবন্দিতে ময়নাল বলেন, আনুমানিক দুপুর ২টা ৪৫ থেকে ৩টার মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে পৌঁছাই। সেখানে শাহিদার সঙ্গে আমার দেখা হলে আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি আমার ছেলের কি খবর? সে বলল, সে কয়েকটি ওয়ার্ডে তায়িমকে খুঁজেছে, কিন্তু পায় নাই। পরবর্তীতে আমরা ২ জন একসঙ্গে বিভিন্ন ওয়ার্ডে এবং ইমার্জেন্সিতে খুঁজতে থাকি। কোথাও খুঁজে না পেয়ে আমরা অস্থির হয়ে যাই। এমন সময় একজন সাংবাদিক আমাকে জিজ্ঞাসা করে আপনি কি কাউকে খুঁজছেন? আমি বললাম ‘ভাই যাত্রাবাড়ি কাজলা এলাকায় আমার ছেলেকে পুলিশ গুলিবিদ্ধ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়েছে। আমি কোথাও খুঁজে পাই নাই’। ওই সাংবাদিক আমার কাছে আমার ছেলের ছবি দেখতে চাইলে আমি আমার ছেলের ছবি দেখাই।

ওই সাংবাদিক বলল, ‘আমার মোবাইলে কিছু মৃত ব্যক্তির ছবি আছে, দেখেন সেখানে আপনার ছেলের ছবি আছে কিনা?’ তখন তার মোবাইল থেকে মৃত ব্যক্তিদের ছবি দেখালে আমি আমার ছেলেকে মৃত অবস্থায় সনাক্ত করি। তখন সে বলল, ‘মর্গে কিছু বেওয়ারিশ লাশ পড়ে আছে, সেখানে আপনি দেখতে পারেন।’

আমি মর্গের উদ্দেশ্যে রওনা করলে সিকিউরিটি আমাকে বাধা দেয়। আমি আমার পরিচয় দেই , ‘আমি একজন পুলিশ সদস্য। যাত্রাবাড়ি এলাকায় আমার ছেলেকে পুলিশ গুলি করে মেরে ফেলেছে। তার লাশ আমি খুঁজে পাচ্ছি না।’ তখন সিকিউরিটি আমাকে মর্গে যেতে দেয়। মর্গে গিয়ে দেখি প্রায় ২০/৩০টি লাশ পড়ে আছে। আমি বারবার আমার ছেলের লাশ খুঁজতে থাকি, কিন্তু খুঁজে পাই নাই। তারপর আরো বিভিন্ন মর্গে যাই, কিন্তু কোথাও খুঁজে পাই নাই।

ময়নাল আরো বলেন, পরবর্তীতে নতুন বিল্ডিংয়ের ইমার্জেন্সি মর্গে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করে আমার ছেলের লাশ পড়ে থাকতে দেখি। সেখানে আরো অনেক লাশ ছিল। আমার ছেলের লাশ পেয়ে আমি এবং আমার শ্যালিকা শাহিদা আক্তার দুজনে কান্নাকাটি করতে থাকি। সেখানে অনেক সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিক আসে। আমার ছেলের লাশের ওপরে, বুকে, পেটে এবং পায়ে অসংখ্য গুলির চিহ্ন দেখতে পাই। তখন আমি উপস্থিত সাংবাদিকদের কে বলি, ‘একটা মানুষ মারতে কয়টি গুলি লাগে?’ পরবর্তীতে মর্গ থেকে বের হয়ে আসি।

রাজারবাগ পুলিশ লাইনস থেকে আমার দুজন সহকর্মী ইন্সপেক্টর নিজাম উদ্দিন ও এসআই দেলোয়ার আমার কাছে আসে এবং আমাকে শান্তনা দেয়। পরবর্তীতে আমার ছেলের লাশ নেওয়ার জন্য শাহবাগ থানায় গিয়ে কার্যক্রম শেষ করে আনুমানিক সন্ধ্যা ৮ টার সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যায়।

ইন্সপেক্টর নিজাম উদ্দিন ও এসআই দেলোয়ার আমাকে বলে, আমরা শাহবাগ থানায় গিয়েছিলাম, সুরতহাল এবং পোস্টমর্টেমের দায়িত্ব শাহবাগ থানার এসআই শাহদাতকে দিয়েছে। আমি এসআই শাহদাত কোথায় জিজ্ঞাসা করলে তারা জানান যে, এসআই শাহদাত থানায় আছে।

আমার সহকর্মীরা আমাকে জানান, এসআই শাহদাত বলেছে সেদিন সুরতহাল ও পোস্টমর্টেমের সময় শেষ হয়ে গেছে, পরের দিন সুরতহাল ও পোস্টমর্টেম হবে। তখন আমরা মর্গের সামনে প্রায় ১ ঘণ্টা অপেক্ষা করে আমার সহকর্মীরাসহ রাজারবাগ পুলিশ লাইনস এ যাই। আমার শ্যালিকা নিজ বাড়িতে যায় এবং আমি রাজারবাগ পুলিশ লাইনস এ অবস্থান করি। আমার ছেলের মৃত্যুর বিষয়ে তখন পর্যন্ত আমার স্ত্রীকে অবগত করানো হয় নাই, কারণ আমার স্ত্রী অসুস্থ ছিল এবং এই সংবাদ শুনলে তার আরো অসুস্থ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল।

জবানবন্দিতে তায়িমের বাবা আরো বলেন, পরের দিন ২১ জুলাই ২০২৪ আনুমানিক সাড়ে ৮টার থেকে ৯টার সময় পরিবারের সদস্য ও সহকর্মীরাসহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অবস্থান করি। মর্গে থেকে আমার ছেলের লাশ নিয়ে সুরতহাল ও পোস্টমর্টেম করার জন্য পোস্টমর্টেম সেকশনে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রায় আনুমানিক সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯ টার সময় শাহবাগ থানা থেকে এসআই শাহদাত আসলে আমার সঙ্গে দেখা হয়। আমি তাকে আমার পরিচয় দেই এবং বলি ‘আমার ছেলেকে পুলিশ গুলিবিদ্ধ করে মেরে ফেলেছে, দয়া করে দ্রুত সুরতহাল ও পোস্টমর্টেমের ব্যবস্থা করেন।’ সে আমাকে দেখে কোন কথা না বলে অন্য একজনের সাথে মোবাইলে কথা বলেন।

পরবর্তীতে এসআই শাহদাত তার অন্যান্য সহকর্মীদের সাথে ব্যক্তিগত কথাবার্তা বলেন এবং ব্যক্তিগত কাজ করতে থাকেন। এসআই শাহদাত অকারণে দেরি করতে থাকেন। আনুমানিক ১২টার সময় এসআই শাহদাত সুরতহাল করার জন্য যায়। সুরতহাল করার সময় পুলিশের গুলিবিদ্ধ হওয়ার চিহ্নগুলো না লিখে কিছু ছিদ্র ও কালো স্পট থাকার কথা লিপিবদ্ধ করেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি, ‘আপনি পুলিশের গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথা না লিখে স্পট থাকার কথা কেন লিখলেন?’ এসআই শাহদাত আমাকে বলল, ‘এটা উপরের অর্ডার, আমি গুলির কথা লিখতে পারবো না।’ এসআই শাহদাত আরো বলেন যে, ‘ছাত্র-জনতার আঘাতে ও গুলিতে আপনার ছেলে মারা গেছে।’ এই বলে সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুত করে আমাকে স্বাক্ষর করতে বলেন। আমি অনেক চিন্তায় পড়ে যাই। আমার ছেলে মারা গেছে এবং চাকরি হারানোর সম্ভাবনা আছে এবং ছেলের মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে, লাশে প্রায় পচন ধরে গেছে।

এই চিন্তা করে আমি সুরতহাল রিপোর্টে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হই। সুরতহাল শেষে প্রায় ২/৩ ঘণ্টা হয়ে যাচ্ছে, পোস্টমর্টেম করাতে পারছি না। এসআই শাহদাত আমাদের কাছে ২/৩ বার আসলে তাকে অনুরোধ করি, আমার ছেলের ময়না তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করে দেন। কিন্তু এসআই শাহদাত কোন সহযোগিতা করেন নাই। পরবর্তীতে আনুমানিক বিকেল ৪টার সময় পোস্টমর্টেম করার জন্য নির্ধারিত কক্ষে নেওয়া হয়। আনুমানিক ৪টা ৩০ মিনিটের দিকে ছেলের পোস্টমর্টেম শেষে আমরা লাশ বুঝে পাই। পরবর্তীতে আমার ছেলের লাশ নিয়ে আমার সহকর্মী ও পরিবারের সদস্যরা সহ রাজারবাগ পুলিশ লাইনস এ যাই এবং গোসল করানোর জন্য প্রস্তুতি নিই। রাজারবাগ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সহকারী ইমাম এএসআই জাহাঙ্গীর ও তার ২ জন সহকর্মী এবং আমার ১ জন আত্মীয় মুফতি হায়দার বিন সাদের গোসল করায়। আমার ছেলের লাশের কোমড়ের বাম পাশে বড় একটি গর্তের দাগ দেখা যায়। আমি এবং আমার সহকর্মীরা এই দাগ দেখে বুঝতে পারি, এটা পিস্তলের গুলির দাগ।

গোসল শেষে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সামনে ১ম জানাজা শেষ করে আত্মীয় স্বজনসহ গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার উদ্দেশ্যে রওনা করি। রাত আনুমানিক ৯টার সময় গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায় ২য় জানাজা শেষ করে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন সম্পন্ন করি।

পুলিশ কর্মকর্তা ময়নাল বলেন, ২৮ জুলাই ২০২৪ আমি ঢাকায় আসি। তায়িমের বন্ধু রাহাত, শাহরিয়ারসহ অন্যান্যদের কাছে শুনতে পাই, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় আমার ছেলে তায়িম প্রত্যেক দিন আন্দোলনে যোগ দিত। তার বন্ধুদের কাছে শুনি, ঘটনার দিন ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল ছিল। ঘটনার সময় তায়িম ও তার বন্ধু শাহরিয়ার, রাহাত যাত্রাবাড়ি কাজলা ফুটওভার ব্রীজ এলাকায় লিটনের চায়ের দোকানের সামনে আন্দোলনের জন্য অবস্থান করছিল।

পরবর্তীতে যাত্রাবাড়ি থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) জাকির হোসেন, ইন্সপেক্টর (অপারেশন) মামুন, এসআই সাজ্জাদের নেতৃত্বে ২০/২৫ জন পুলিশ আমার ছেলে তায়িম ও তার বন্ধুদের কে চতুর্দিক দিয়ে ধাওয়া করলে কোন দিকে যেতে না পেরে আমার ছেলে ও তার বন্ধুরা লিটনের চায়ের দোকানে প্রবেশ করে এবং চায়ের দোকানের শাটার টেনে নিচে নামায়। পুলিশ সদস্যরা দোকানের শাটার খুলে আমার ছেলে ও তার বন্ধুদেরকে বের করে লাঠি, রাইফেলের বাট দিয়ে অনেক মারতে থাকে। পরবর্তীতে পুলিশ সদস্যরা আমার ছেলে ও তার বন্ধুদেরকে দৌড় দিয়ে চলে যেতে বলে। আমার ছেলে দৌড় দিলে ইন্সপেক্টর (অপারেশন) মামুন পিস্তল দিয়ে গুলি করে এবং এসআই সাজ্জাদ গুলি করে।

আমার ছেলে মা মা করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তার বন্ধু রাহাত তায়িম কে পিছনের দিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করে। তখনই ইন্সপেক্টর জাকির খুব কাছ থেকে অনেকবার গুলি করে। আমার ছেলে মা মা করে কাদতে থাকে। একটি গুলি রাহাতের পায়ে লাগে। রাহাত তার জীবন বাচাতে আমার ছেলেকে ফেলে রেখে চলে যায়। আমার ছেলে সেখানে পড়ে থাকে এবং গড়াগড়ি করতে থাকে। পরবর্তীতে তায়িম এর আরেক বন্ধু শাহরিয়ার ও চা দোকানদার লিটন আমার ছেলেকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। ইন্সপেক্টর জাকির, ইন্সপেক্টর মামুন, এসআই সাজ্জাদ বাধা দেয়। আমার ছেলে অনেকক্ষণ মাটিতে পড়ে থাকে এবং গড়াগড়ি করতে থাকে (এ সময় সাক্ষী কান্নায় ভেঙে পড়েন)।

পরবর্তীতে একটি ভ্যানে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আমার ছেলেকে প্রেরণ করে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

পুলিশ গুলি করলে তায়িম মা মা বলে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে: ট্রাইব্যুনালে শহীদ তায়িমের বাবা ময়নাল হোসেন  

আপডেট সময় : ০৯:৫০:৪৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

জাতীয় ডেস্ক: জুলাই বিপ্লবে যাত্রাবাড়িতে শহীদ ইমাম হাসান তায়িম হত্যা মামলায় সপ্তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন তায়িমের বাবা পুলিশ কর্মকর্তা এসআই ময়নাল হোসেন। বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ জবানবন্দিতে তিনি বলেন, আমার ছেলে ইমাম হাসান তায়িম ভূইয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যাত্রাবাড়ি এলাকায় অংশগ্রহণ করেছিল। আমার জানা মতে সে ১৫-১৯ জুলাই ২০২৪ পর্যন্ত যাত্রাবাড়ি কাজলা এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল।

জবানবন্দিতে ময়নাল বলেন, আনুমানিক দুপুর ২টা ৪৫ থেকে ৩টার মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে পৌঁছাই। সেখানে শাহিদার সঙ্গে আমার দেখা হলে আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি আমার ছেলের কি খবর? সে বলল, সে কয়েকটি ওয়ার্ডে তায়িমকে খুঁজেছে, কিন্তু পায় নাই। পরবর্তীতে আমরা ২ জন একসঙ্গে বিভিন্ন ওয়ার্ডে এবং ইমার্জেন্সিতে খুঁজতে থাকি। কোথাও খুঁজে না পেয়ে আমরা অস্থির হয়ে যাই। এমন সময় একজন সাংবাদিক আমাকে জিজ্ঞাসা করে আপনি কি কাউকে খুঁজছেন? আমি বললাম ‘ভাই যাত্রাবাড়ি কাজলা এলাকায় আমার ছেলেকে পুলিশ গুলিবিদ্ধ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়েছে। আমি কোথাও খুঁজে পাই নাই’। ওই সাংবাদিক আমার কাছে আমার ছেলের ছবি দেখতে চাইলে আমি আমার ছেলের ছবি দেখাই।

ওই সাংবাদিক বলল, ‘আমার মোবাইলে কিছু মৃত ব্যক্তির ছবি আছে, দেখেন সেখানে আপনার ছেলের ছবি আছে কিনা?’ তখন তার মোবাইল থেকে মৃত ব্যক্তিদের ছবি দেখালে আমি আমার ছেলেকে মৃত অবস্থায় সনাক্ত করি। তখন সে বলল, ‘মর্গে কিছু বেওয়ারিশ লাশ পড়ে আছে, সেখানে আপনি দেখতে পারেন।’

আমি মর্গের উদ্দেশ্যে রওনা করলে সিকিউরিটি আমাকে বাধা দেয়। আমি আমার পরিচয় দেই , ‘আমি একজন পুলিশ সদস্য। যাত্রাবাড়ি এলাকায় আমার ছেলেকে পুলিশ গুলি করে মেরে ফেলেছে। তার লাশ আমি খুঁজে পাচ্ছি না।’ তখন সিকিউরিটি আমাকে মর্গে যেতে দেয়। মর্গে গিয়ে দেখি প্রায় ২০/৩০টি লাশ পড়ে আছে। আমি বারবার আমার ছেলের লাশ খুঁজতে থাকি, কিন্তু খুঁজে পাই নাই। তারপর আরো বিভিন্ন মর্গে যাই, কিন্তু কোথাও খুঁজে পাই নাই।

ময়নাল আরো বলেন, পরবর্তীতে নতুন বিল্ডিংয়ের ইমার্জেন্সি মর্গে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করে আমার ছেলের লাশ পড়ে থাকতে দেখি। সেখানে আরো অনেক লাশ ছিল। আমার ছেলের লাশ পেয়ে আমি এবং আমার শ্যালিকা শাহিদা আক্তার দুজনে কান্নাকাটি করতে থাকি। সেখানে অনেক সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিক আসে। আমার ছেলের লাশের ওপরে, বুকে, পেটে এবং পায়ে অসংখ্য গুলির চিহ্ন দেখতে পাই। তখন আমি উপস্থিত সাংবাদিকদের কে বলি, ‘একটা মানুষ মারতে কয়টি গুলি লাগে?’ পরবর্তীতে মর্গ থেকে বের হয়ে আসি।

রাজারবাগ পুলিশ লাইনস থেকে আমার দুজন সহকর্মী ইন্সপেক্টর নিজাম উদ্দিন ও এসআই দেলোয়ার আমার কাছে আসে এবং আমাকে শান্তনা দেয়। পরবর্তীতে আমার ছেলের লাশ নেওয়ার জন্য শাহবাগ থানায় গিয়ে কার্যক্রম শেষ করে আনুমানিক সন্ধ্যা ৮ টার সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যায়।

ইন্সপেক্টর নিজাম উদ্দিন ও এসআই দেলোয়ার আমাকে বলে, আমরা শাহবাগ থানায় গিয়েছিলাম, সুরতহাল এবং পোস্টমর্টেমের দায়িত্ব শাহবাগ থানার এসআই শাহদাতকে দিয়েছে। আমি এসআই শাহদাত কোথায় জিজ্ঞাসা করলে তারা জানান যে, এসআই শাহদাত থানায় আছে।

আমার সহকর্মীরা আমাকে জানান, এসআই শাহদাত বলেছে সেদিন সুরতহাল ও পোস্টমর্টেমের সময় শেষ হয়ে গেছে, পরের দিন সুরতহাল ও পোস্টমর্টেম হবে। তখন আমরা মর্গের সামনে প্রায় ১ ঘণ্টা অপেক্ষা করে আমার সহকর্মীরাসহ রাজারবাগ পুলিশ লাইনস এ যাই। আমার শ্যালিকা নিজ বাড়িতে যায় এবং আমি রাজারবাগ পুলিশ লাইনস এ অবস্থান করি। আমার ছেলের মৃত্যুর বিষয়ে তখন পর্যন্ত আমার স্ত্রীকে অবগত করানো হয় নাই, কারণ আমার স্ত্রী অসুস্থ ছিল এবং এই সংবাদ শুনলে তার আরো অসুস্থ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল।

জবানবন্দিতে তায়িমের বাবা আরো বলেন, পরের দিন ২১ জুলাই ২০২৪ আনুমানিক সাড়ে ৮টার থেকে ৯টার সময় পরিবারের সদস্য ও সহকর্মীরাসহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অবস্থান করি। মর্গে থেকে আমার ছেলের লাশ নিয়ে সুরতহাল ও পোস্টমর্টেম করার জন্য পোস্টমর্টেম সেকশনে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রায় আনুমানিক সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯ টার সময় শাহবাগ থানা থেকে এসআই শাহদাত আসলে আমার সঙ্গে দেখা হয়। আমি তাকে আমার পরিচয় দেই এবং বলি ‘আমার ছেলেকে পুলিশ গুলিবিদ্ধ করে মেরে ফেলেছে, দয়া করে দ্রুত সুরতহাল ও পোস্টমর্টেমের ব্যবস্থা করেন।’ সে আমাকে দেখে কোন কথা না বলে অন্য একজনের সাথে মোবাইলে কথা বলেন।

পরবর্তীতে এসআই শাহদাত তার অন্যান্য সহকর্মীদের সাথে ব্যক্তিগত কথাবার্তা বলেন এবং ব্যক্তিগত কাজ করতে থাকেন। এসআই শাহদাত অকারণে দেরি করতে থাকেন। আনুমানিক ১২টার সময় এসআই শাহদাত সুরতহাল করার জন্য যায়। সুরতহাল করার সময় পুলিশের গুলিবিদ্ধ হওয়ার চিহ্নগুলো না লিখে কিছু ছিদ্র ও কালো স্পট থাকার কথা লিপিবদ্ধ করেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি, ‘আপনি পুলিশের গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথা না লিখে স্পট থাকার কথা কেন লিখলেন?’ এসআই শাহদাত আমাকে বলল, ‘এটা উপরের অর্ডার, আমি গুলির কথা লিখতে পারবো না।’ এসআই শাহদাত আরো বলেন যে, ‘ছাত্র-জনতার আঘাতে ও গুলিতে আপনার ছেলে মারা গেছে।’ এই বলে সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুত করে আমাকে স্বাক্ষর করতে বলেন। আমি অনেক চিন্তায় পড়ে যাই। আমার ছেলে মারা গেছে এবং চাকরি হারানোর সম্ভাবনা আছে এবং ছেলের মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে, লাশে প্রায় পচন ধরে গেছে।

এই চিন্তা করে আমি সুরতহাল রিপোর্টে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হই। সুরতহাল শেষে প্রায় ২/৩ ঘণ্টা হয়ে যাচ্ছে, পোস্টমর্টেম করাতে পারছি না। এসআই শাহদাত আমাদের কাছে ২/৩ বার আসলে তাকে অনুরোধ করি, আমার ছেলের ময়না তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করে দেন। কিন্তু এসআই শাহদাত কোন সহযোগিতা করেন নাই। পরবর্তীতে আনুমানিক বিকেল ৪টার সময় পোস্টমর্টেম করার জন্য নির্ধারিত কক্ষে নেওয়া হয়। আনুমানিক ৪টা ৩০ মিনিটের দিকে ছেলের পোস্টমর্টেম শেষে আমরা লাশ বুঝে পাই। পরবর্তীতে আমার ছেলের লাশ নিয়ে আমার সহকর্মী ও পরিবারের সদস্যরা সহ রাজারবাগ পুলিশ লাইনস এ যাই এবং গোসল করানোর জন্য প্রস্তুতি নিই। রাজারবাগ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সহকারী ইমাম এএসআই জাহাঙ্গীর ও তার ২ জন সহকর্মী এবং আমার ১ জন আত্মীয় মুফতি হায়দার বিন সাদের গোসল করায়। আমার ছেলের লাশের কোমড়ের বাম পাশে বড় একটি গর্তের দাগ দেখা যায়। আমি এবং আমার সহকর্মীরা এই দাগ দেখে বুঝতে পারি, এটা পিস্তলের গুলির দাগ।

গোসল শেষে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সামনে ১ম জানাজা শেষ করে আত্মীয় স্বজনসহ গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার উদ্দেশ্যে রওনা করি। রাত আনুমানিক ৯টার সময় গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায় ২য় জানাজা শেষ করে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন সম্পন্ন করি।

পুলিশ কর্মকর্তা ময়নাল বলেন, ২৮ জুলাই ২০২৪ আমি ঢাকায় আসি। তায়িমের বন্ধু রাহাত, শাহরিয়ারসহ অন্যান্যদের কাছে শুনতে পাই, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় আমার ছেলে তায়িম প্রত্যেক দিন আন্দোলনে যোগ দিত। তার বন্ধুদের কাছে শুনি, ঘটনার দিন ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল ছিল। ঘটনার সময় তায়িম ও তার বন্ধু শাহরিয়ার, রাহাত যাত্রাবাড়ি কাজলা ফুটওভার ব্রীজ এলাকায় লিটনের চায়ের দোকানের সামনে আন্দোলনের জন্য অবস্থান করছিল।

পরবর্তীতে যাত্রাবাড়ি থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) জাকির হোসেন, ইন্সপেক্টর (অপারেশন) মামুন, এসআই সাজ্জাদের নেতৃত্বে ২০/২৫ জন পুলিশ আমার ছেলে তায়িম ও তার বন্ধুদের কে চতুর্দিক দিয়ে ধাওয়া করলে কোন দিকে যেতে না পেরে আমার ছেলে ও তার বন্ধুরা লিটনের চায়ের দোকানে প্রবেশ করে এবং চায়ের দোকানের শাটার টেনে নিচে নামায়। পুলিশ সদস্যরা দোকানের শাটার খুলে আমার ছেলে ও তার বন্ধুদেরকে বের করে লাঠি, রাইফেলের বাট দিয়ে অনেক মারতে থাকে। পরবর্তীতে পুলিশ সদস্যরা আমার ছেলে ও তার বন্ধুদেরকে দৌড় দিয়ে চলে যেতে বলে। আমার ছেলে দৌড় দিলে ইন্সপেক্টর (অপারেশন) মামুন পিস্তল দিয়ে গুলি করে এবং এসআই সাজ্জাদ গুলি করে।

আমার ছেলে মা মা করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তার বন্ধু রাহাত তায়িম কে পিছনের দিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করে। তখনই ইন্সপেক্টর জাকির খুব কাছ থেকে অনেকবার গুলি করে। আমার ছেলে মা মা করে কাদতে থাকে। একটি গুলি রাহাতের পায়ে লাগে। রাহাত তার জীবন বাচাতে আমার ছেলেকে ফেলে রেখে চলে যায়। আমার ছেলে সেখানে পড়ে থাকে এবং গড়াগড়ি করতে থাকে। পরবর্তীতে তায়িম এর আরেক বন্ধু শাহরিয়ার ও চা দোকানদার লিটন আমার ছেলেকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। ইন্সপেক্টর জাকির, ইন্সপেক্টর মামুন, এসআই সাজ্জাদ বাধা দেয়। আমার ছেলে অনেকক্ষণ মাটিতে পড়ে থাকে এবং গড়াগড়ি করতে থাকে (এ সময় সাক্ষী কান্নায় ভেঙে পড়েন)।

পরবর্তীতে একটি ভ্যানে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আমার ছেলেকে প্রেরণ করে।