ঢাকা ১২:৩২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

২৩ শে জুন,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর প্রান্তরে “

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১০:৪৮:৩৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬ ৫৫ বার পড়া হয়েছে

সম্পাদকীয়: ‎১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২২ জুন রাতে ক্লাইভ তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে কাশিমবাজার কুটি হয়ে পলাশীর আমবাগানে ছাউনি ফেলে অবস্থান নেন।ক্লাইভ সৈন্যদের বিশ্রাম নিতে বলে, নিজে যুদ্ধ পরিকল্পনা সাজাতে বসলেন।

যুদ্ধের কিছুদিন আগেই মীর জাফর ও অন্যান্য ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে রবার্ট ক্লাইভ একটি গোপন চুক্তি করেন। এই চুক্তি অনুযায়ী, মীর জাফর ও তাঁর অনুসারীরা নবাবকে কোনও ধরনের সামরিক সহায়তা দেবেন না এবং যুদ্ধের ময়দানে নিষ্ক্রিয় থাকবেন।

‎২৩ জুন, ভোর রাতে, কোম্পানি যুদ্ধের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। তাদের বাহিনীতে ছিল—৯০০ ইউরোপীয় সৈন্য, ২১০০ দেশীয় সিপাহী এবং ৮টি কামান। পলাশীর প্রান্তরে যুদ্ধের জন্য তারা তৈরি হয়ে বসে থাকে।

‎এই সময়, নবাব সিরাজউদ্দৌলা তাঁর বিশাল বাহিনী নিয়ে পলাশীর প্রান্তরে উপস্থিত হন। নবাবের বাহিনীতে ছিল ৫০ হাজার সৈন্য, ৫৩টি কামান এবং ২০০টি যুদ্ধহাতি। নবাব তাঁর বিশাল বাহিনীকে তিন ভাগে ভাগ করে যুদ্ধ পরিকল্পনা তৈরি করেন— মাঝখান দিয়ে তিনি নিজে, বাম দিক দিয়ে মোহনলাল ও মীর মদন এবং ডান দিক দিয়ে মীর জাফর, রায়দুর্লভ ও কতলু খানকে স্থাপন করেন।

‎পরিকল্পনা ছিল, তিনি নিজে মাঝখান থেকে বা সামনের দিকে থেকে দুই প্রান্তের বাহিনী একযোগে ক্লাইভের বাহিনীকে ঘিরে ফেলবে। কিন্তু যুদ্ধের আগে থেকেই নবাব সিরাজউদ্দৌলা মীর জাফরের প্রতি সন্দেহ পোষণ করতে থাকেন। তাই তিনি তাঁর বিশ্বস্ত সেনাপতি মোহনলাল ও মীর মদনকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেন।

‎এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে, ক্লাইভ গোপনে আবারও দূত পাঠান মীর জাফরের কাছে, নিশ্চিত হওয়ার জন্য—তিনি আসলেই চুক্তি অনুযায়ী নিষ্ক্রিয় থাকবেন কি না। জবাবে মীর জাফর আশ্বস্ত করেন— “আমি পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নিষ্ক্রিয় থাকবো।”

‎সকাল ৮টা বেজে যায়। হঠাৎ করে নবাব সিরাজউদ্দৌলা তাঁর নীরবতা ভেঙে কামানের গোলা নিক্ষেপের নির্দেশ দেন। এই কামানের শব্দ দিয়েই পলাশীর যুদ্ধের সূচনা হয়। তখনো ইংরেজ কোম্পানির পক্ষ থেকে কোনও প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি—তারা কামানের গোলার সীমার বাইরে অবস্থান করছিল। নবাবের গোলন্দাজরা এলোমেলোভাবে গোলা বর্ষণ করতে থাকেন, যা প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী চলে।

‎সকাল ১০টার দিকে কোম্পানির বাহিনী পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে কামানের গোলা ছুড়তে শুরু করে। এই সময় নবাব তাঁর বাহিনীকে আক্রমণের নির্দেশ দেন। বাম দিকের বাহিনী—মোহনলাল ও মীর মদন বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকেন। কিন্তু ডান পাশের বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা দেখে নবাব অধৈর্য হয়ে নির্দেশ দেন, “অগ্রসর হও!” জবাবে মীর জাফর বলেন— “সুবিধাজনক সময় দেখছি।”এভাবে ডান পাশের বিশ্বাসঘাতকতার মধ্যে যুদ্ধ চলতে থাকে।

‎দুপুর ১২টার দিকে, কোম্পানির কামানের এক বিস্ফোরণে মীর মদন শহীদ হন। এর ফলে বামদিকের সৈনিকরা নেতৃত্ব হারিয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। দুপুর ১টার দিকে আকাশে বৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা দিলে, রবার্ট ক্লাইভ তাঁর কামানগুলো ঢেকে রাখতে বলেন। কিন্তু নবাব সেই ব্যবস্থা নেননি, ফলে বৃষ্টিতে তাঁর অধিকাংশ কামান ভিজে অকার্যকর হয়ে পড়ে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ক্লাইভ সামনে এগিয়ে কামানের গোলা নিক্ষেপে তীব্র আক্রমণ শুরু করেন।

‎বিকাল ৩টা নাগাদ নবাব মীর জাফর, রায়দুর্লভ ও কতলু খানের নিষ্ক্রিয়তা দেখে দিশেহারা হয়ে পড়েন। মোহনলালের পরামর্শে নবাব পেছনে সরে যেতে থাকেন। সৈন্যরা বিভ্রান্ত হয়ে পলায়ন শুরু করে। বিকাল ৪টা বাজে। নবাব পরিস্থিতি পুরোপুরি বিপর্যস্ত দেখে রাজপ্রাসাদে (মুর্শিদাবাদ) ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি হাতির পিঠে করে কিছু বিশ্বস্ত অনুচর নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করেন। বিকাল ৫টার মধ্যে নবাবের পলায়নের পর পুরো বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। রবার্ট ক্লাইভ বিজয়ের ঘোষণা দেন এবং পলাশীর আমবাগান ইংরেজ বাহিনীর সম্পূর্ণ দখলে আসে। এই যুদ্ধ মাত্র ৭–৮ ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়। এটাই ছিল নবাব সিরাজউদ্দৌলার দ্বিতীয় পরাজয়।

‎এই যুদ্ধে— নবাবের ৫০ হাজার সৈন্যের মধ্যে প্রায় ৫০০ জন নিহত হন, অন্যদিকে কোম্পানির মাত্র ২২ জন নিহত এবং ৫০ জন আহত হন। স্বল্পসংখ্যক সৈন্য নিয়ে কোম্পানি এক অবিশ্বাস্য বিজয় অর্জন করে। যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করার পর নবাব সিরাজউদ্দৌলা মুর্শিদাবাদে ফিরে যান এবং সেখান থেকে আত্মগোপন করেন। কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা তাঁর পিছু ছাড়েনি। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে তিনি ধরা পড়েন এবং সেনাপতি মীর জাফরের পুত্র মীরনের আদেশে তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সিরাজের এই মর্মান্তিক পরিণতি শুধু একটি নবাবের মৃত্যুই নয়, এটি ছিল বাংলার স্বাধীনতার শেষ আলো নিভে যাওয়ার মুহূর্ত।

‎তথ্যসূত্র :
‎১. বাংলার ইতিহাস (১২০০-১৮৫৭),আবদুল করিম।
‎২. সিরাজউদ্দৌলার জীবনচরিত, মুনশি মোহাম্মদ রেজা।
‎৩. The History of Bengal, Volume II, Dr. Ramesh Chandra Majumdar।
‎৪. The Military System of the East India Company, S.N. Sen।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

২৩ শে জুন,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর প্রান্তরে “

আপডেট সময় : ১০:৪৮:৩৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

সম্পাদকীয়: ‎১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২২ জুন রাতে ক্লাইভ তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে কাশিমবাজার কুটি হয়ে পলাশীর আমবাগানে ছাউনি ফেলে অবস্থান নেন।ক্লাইভ সৈন্যদের বিশ্রাম নিতে বলে, নিজে যুদ্ধ পরিকল্পনা সাজাতে বসলেন।

যুদ্ধের কিছুদিন আগেই মীর জাফর ও অন্যান্য ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে রবার্ট ক্লাইভ একটি গোপন চুক্তি করেন। এই চুক্তি অনুযায়ী, মীর জাফর ও তাঁর অনুসারীরা নবাবকে কোনও ধরনের সামরিক সহায়তা দেবেন না এবং যুদ্ধের ময়দানে নিষ্ক্রিয় থাকবেন।

‎২৩ জুন, ভোর রাতে, কোম্পানি যুদ্ধের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। তাদের বাহিনীতে ছিল—৯০০ ইউরোপীয় সৈন্য, ২১০০ দেশীয় সিপাহী এবং ৮টি কামান। পলাশীর প্রান্তরে যুদ্ধের জন্য তারা তৈরি হয়ে বসে থাকে।

‎এই সময়, নবাব সিরাজউদ্দৌলা তাঁর বিশাল বাহিনী নিয়ে পলাশীর প্রান্তরে উপস্থিত হন। নবাবের বাহিনীতে ছিল ৫০ হাজার সৈন্য, ৫৩টি কামান এবং ২০০টি যুদ্ধহাতি। নবাব তাঁর বিশাল বাহিনীকে তিন ভাগে ভাগ করে যুদ্ধ পরিকল্পনা তৈরি করেন— মাঝখান দিয়ে তিনি নিজে, বাম দিক দিয়ে মোহনলাল ও মীর মদন এবং ডান দিক দিয়ে মীর জাফর, রায়দুর্লভ ও কতলু খানকে স্থাপন করেন।

‎পরিকল্পনা ছিল, তিনি নিজে মাঝখান থেকে বা সামনের দিকে থেকে দুই প্রান্তের বাহিনী একযোগে ক্লাইভের বাহিনীকে ঘিরে ফেলবে। কিন্তু যুদ্ধের আগে থেকেই নবাব সিরাজউদ্দৌলা মীর জাফরের প্রতি সন্দেহ পোষণ করতে থাকেন। তাই তিনি তাঁর বিশ্বস্ত সেনাপতি মোহনলাল ও মীর মদনকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেন।

‎এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে, ক্লাইভ গোপনে আবারও দূত পাঠান মীর জাফরের কাছে, নিশ্চিত হওয়ার জন্য—তিনি আসলেই চুক্তি অনুযায়ী নিষ্ক্রিয় থাকবেন কি না। জবাবে মীর জাফর আশ্বস্ত করেন— “আমি পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নিষ্ক্রিয় থাকবো।”

‎সকাল ৮টা বেজে যায়। হঠাৎ করে নবাব সিরাজউদ্দৌলা তাঁর নীরবতা ভেঙে কামানের গোলা নিক্ষেপের নির্দেশ দেন। এই কামানের শব্দ দিয়েই পলাশীর যুদ্ধের সূচনা হয়। তখনো ইংরেজ কোম্পানির পক্ষ থেকে কোনও প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি—তারা কামানের গোলার সীমার বাইরে অবস্থান করছিল। নবাবের গোলন্দাজরা এলোমেলোভাবে গোলা বর্ষণ করতে থাকেন, যা প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী চলে।

‎সকাল ১০টার দিকে কোম্পানির বাহিনী পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে কামানের গোলা ছুড়তে শুরু করে। এই সময় নবাব তাঁর বাহিনীকে আক্রমণের নির্দেশ দেন। বাম দিকের বাহিনী—মোহনলাল ও মীর মদন বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকেন। কিন্তু ডান পাশের বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা দেখে নবাব অধৈর্য হয়ে নির্দেশ দেন, “অগ্রসর হও!” জবাবে মীর জাফর বলেন— “সুবিধাজনক সময় দেখছি।”এভাবে ডান পাশের বিশ্বাসঘাতকতার মধ্যে যুদ্ধ চলতে থাকে।

‎দুপুর ১২টার দিকে, কোম্পানির কামানের এক বিস্ফোরণে মীর মদন শহীদ হন। এর ফলে বামদিকের সৈনিকরা নেতৃত্ব হারিয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। দুপুর ১টার দিকে আকাশে বৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা দিলে, রবার্ট ক্লাইভ তাঁর কামানগুলো ঢেকে রাখতে বলেন। কিন্তু নবাব সেই ব্যবস্থা নেননি, ফলে বৃষ্টিতে তাঁর অধিকাংশ কামান ভিজে অকার্যকর হয়ে পড়ে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ক্লাইভ সামনে এগিয়ে কামানের গোলা নিক্ষেপে তীব্র আক্রমণ শুরু করেন।

‎বিকাল ৩টা নাগাদ নবাব মীর জাফর, রায়দুর্লভ ও কতলু খানের নিষ্ক্রিয়তা দেখে দিশেহারা হয়ে পড়েন। মোহনলালের পরামর্শে নবাব পেছনে সরে যেতে থাকেন। সৈন্যরা বিভ্রান্ত হয়ে পলায়ন শুরু করে। বিকাল ৪টা বাজে। নবাব পরিস্থিতি পুরোপুরি বিপর্যস্ত দেখে রাজপ্রাসাদে (মুর্শিদাবাদ) ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি হাতির পিঠে করে কিছু বিশ্বস্ত অনুচর নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করেন। বিকাল ৫টার মধ্যে নবাবের পলায়নের পর পুরো বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। রবার্ট ক্লাইভ বিজয়ের ঘোষণা দেন এবং পলাশীর আমবাগান ইংরেজ বাহিনীর সম্পূর্ণ দখলে আসে। এই যুদ্ধ মাত্র ৭–৮ ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়। এটাই ছিল নবাব সিরাজউদ্দৌলার দ্বিতীয় পরাজয়।

‎এই যুদ্ধে— নবাবের ৫০ হাজার সৈন্যের মধ্যে প্রায় ৫০০ জন নিহত হন, অন্যদিকে কোম্পানির মাত্র ২২ জন নিহত এবং ৫০ জন আহত হন। স্বল্পসংখ্যক সৈন্য নিয়ে কোম্পানি এক অবিশ্বাস্য বিজয় অর্জন করে। যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করার পর নবাব সিরাজউদ্দৌলা মুর্শিদাবাদে ফিরে যান এবং সেখান থেকে আত্মগোপন করেন। কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা তাঁর পিছু ছাড়েনি। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে তিনি ধরা পড়েন এবং সেনাপতি মীর জাফরের পুত্র মীরনের আদেশে তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সিরাজের এই মর্মান্তিক পরিণতি শুধু একটি নবাবের মৃত্যুই নয়, এটি ছিল বাংলার স্বাধীনতার শেষ আলো নিভে যাওয়ার মুহূর্ত।

‎তথ্যসূত্র :
‎১. বাংলার ইতিহাস (১২০০-১৮৫৭),আবদুল করিম।
‎২. সিরাজউদ্দৌলার জীবনচরিত, মুনশি মোহাম্মদ রেজা।
‎৩. The History of Bengal, Volume II, Dr. Ramesh Chandra Majumdar।
‎৪. The Military System of the East India Company, S.N. Sen।