ঢাকা ০২:৩৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডেথ সেল থেকে সংসদে জামায়াত নেতা আজহার

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৩:৩০:০০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১১৩ বার পড়া হয়েছে

প্রসঙ্গ অনলাইন: ফাঁসির দণ্ড মাথায় নিয়ে দীর্ঘ ১০ বছর কারাগারের কনডেম সেলের অন্ধপ্রকোষ্ঠে দিন কাটিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম। চলছিল ফাঁসি কার্যকরের আইনি প্রক্রিয়া। তার কবরের স্থানও নির্ধারণ করেছিল ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকার।

তবে চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে ফ্যাসিবাদের পতনের পর উচ্চ আদালত থেকে বেকসুর খালাস পেয়ে মুক্ত বাতাসে ফেরার সুযোগ পান এ নেতা। সক্রিয় হন দলীয় কর্মকাণ্ডেও। শুধু তাই নয়, মুক্তির মাত্র ৯ মাসের মাথায় গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন তিনি। ডেথ সেল থেকে সংসদে যাওয়ার এ বিরল সৌভাগ্যের বিষয়টি নিয়ে তাই রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোচিত হচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে রংপুর-২ আসন থেকে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এটিএম আজহারুল ইসলাম। প্রচার-গণসংযোগে বেশ সাড়া পড়েছিল তার পক্ষে। তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ভোটের ফলাফলে। ৫৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিএনপির প্রার্থীকে হারিয়ে সংসদ সদস্য হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন তিনি।

বেসরকারিভাবে ঘোষিত ফল অনুযায়ী দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী এটিএম আজহারুল ইসলাম পেয়েছেন এক লাখ ৩৫ হাজার ৫৫৬ ভোট। অন্যদিকে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষের প্রার্থী মোহাম্মদ আলী সরকার পেয়েছেন ৮০ হাজার ৫৩৮ ভোট। অর্থাৎ ৫৫ হাজারের বেশি ভোটে বিজয়ী হন তিনি। তার এ বিজয়ে দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে বেশ উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে।

সূত্রমতে, জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলামকে ২০১২ সালের ২২ আগস্ট রাজধানীর মগবাজারের নিজ বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মুক্তিযুদ্ধের সময় কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে। এরপর সাজানো মিথ্যা সাক্ষীর মাধ্যমে ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় বিতর্কিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের ২৮ জানুয়ারি আপিল করেন আজহারুল ইসলাম। শুনানি শেষে ২০১৯ সালের ৩১ অক্টোবর আওয়ামী লীগের তৎকালীন আপিল বিভাগ মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে। এরপর ওই রায় রিভিউ চেয়ে ২০২০ সালের ১৯ জুলাই আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময়ে পতিত আওয়ামী লীগ সরকার তাকে ফাঁসিতে ঝোলানোর সব আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছিল। যে কোনো সময় ফাঁসি কার্যকরের শঙ্কা নিয়ে কারারুদ্ধ দিন কাটাতেন তিনি। এ সময় তিনি নানা রোগে আক্রান্ত হন।

তবে চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর তার মুক্তির পথ খুলে যায়। তার মুক্তির জন্য উচ্চ আদালতে আপিলের পাশাপাশি দলের পক্ষ থেকে চলে বিভিন্ন আন্দোলন। একপর্যায়ে শুনানি শেষে গত বছরের ২৭ মে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এটিএম আজহারকে বেকসুর খালাস দেন। পরদিনই রাজধানীর শাহবাগে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিজন সেল থেকে দীর্ঘ প্রায় ১৩ বছর কারারুদ্ধ থাকার পর তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।

এদিকে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার খবরে গতকাল শুক্রবার সকাল থেকেই তার বাসায় শুভেচ্ছা জানাতে ভিড় করেন জামায়াতের নেতাকর্মী ও স্থানীয় ভোটাররা। এ সময় তিনি বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জবাসীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার প্রত্যাশার কথা জানান।

মৃত্যুদণ্ডের মুখ থেকে ফিরে সংসদে যাওয়ার সুযোগ প্রসঙ্গে তিনি আমার দেশকে বলেন, মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে আজ আমি পৃথিবীর মুখ দেখতে পাচ্ছি। নির্বাচনি এলাকার সাধারণ মানুষ আমাকে ভালোবেসে ভোট দেওয়ার কারণে বিজয় লাভ করেছি। তিনি সবাইকে নিয়ে এলাকার উন্নয়নের পাশাপাশি ইসলামের খেদমত করে বাকি জীবনটুকু অতিবাহিত করার কথা বলেন।

এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, আমার চাওয়া পাওয়ার কিছু নেই। এ আসনে আগে যারা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন, এত বিশাল ভোটের ব্যবধানে কেউ নির্বাচিত হননি। ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে এ এলাকার সর্বসাধারণ যেভাবে আমাকে সম্মান দিয়েছেন, এ সম্মানটুকু আমি রক্ষা করতে চাই। আমাকে যারা ভোট দিয়েছেন আমি তাদেরও এমপি। যারা দেননি তাদেরও এমপি, এখানে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।

কনডেম সেলে থাকার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার আমার তো ফাঁসি নির্ধারিত করে রেখেছিল। বাড়ির পাশে কবর কোথায় হবে, সেটিও প্রশাসনের লোকজন নির্ধারণ করে দিয়েছিল। মহান আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন হয়তো আমার হাত দিয়ে ভালো কিছু করিয়ে নেবেন।

আজহার বলেন, আমি ১৪ বছর জেলখানায় থাকার আগে এ এলাকার বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে মানুষের পাশে থেকে অনেক কাজ করেছি। এখন হওয়ায় কাজের পরিধি আরো বেড়েছে। সরকারি বরাদ্দের অর্থের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থান থেকে অর্থ সংগ্রহ করে বদরগঞ্জ তারাগঞ্জের উন্নয়নে ব্যয় করা হবে বলেও জানান তিনি। ভালো কাজে সহযোগিতার পাশাপাশি সবার কাছে দোয়া চান জামায়াতের এ নেতা।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

ডেথ সেল থেকে সংসদে জামায়াত নেতা আজহার

আপডেট সময় : ০৩:৩০:০০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

প্রসঙ্গ অনলাইন: ফাঁসির দণ্ড মাথায় নিয়ে দীর্ঘ ১০ বছর কারাগারের কনডেম সেলের অন্ধপ্রকোষ্ঠে দিন কাটিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম। চলছিল ফাঁসি কার্যকরের আইনি প্রক্রিয়া। তার কবরের স্থানও নির্ধারণ করেছিল ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকার।

তবে চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে ফ্যাসিবাদের পতনের পর উচ্চ আদালত থেকে বেকসুর খালাস পেয়ে মুক্ত বাতাসে ফেরার সুযোগ পান এ নেতা। সক্রিয় হন দলীয় কর্মকাণ্ডেও। শুধু তাই নয়, মুক্তির মাত্র ৯ মাসের মাথায় গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন তিনি। ডেথ সেল থেকে সংসদে যাওয়ার এ বিরল সৌভাগ্যের বিষয়টি নিয়ে তাই রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোচিত হচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে রংপুর-২ আসন থেকে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এটিএম আজহারুল ইসলাম। প্রচার-গণসংযোগে বেশ সাড়া পড়েছিল তার পক্ষে। তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ভোটের ফলাফলে। ৫৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিএনপির প্রার্থীকে হারিয়ে সংসদ সদস্য হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন তিনি।

বেসরকারিভাবে ঘোষিত ফল অনুযায়ী দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী এটিএম আজহারুল ইসলাম পেয়েছেন এক লাখ ৩৫ হাজার ৫৫৬ ভোট। অন্যদিকে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষের প্রার্থী মোহাম্মদ আলী সরকার পেয়েছেন ৮০ হাজার ৫৩৮ ভোট। অর্থাৎ ৫৫ হাজারের বেশি ভোটে বিজয়ী হন তিনি। তার এ বিজয়ে দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে বেশ উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে।

সূত্রমতে, জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলামকে ২০১২ সালের ২২ আগস্ট রাজধানীর মগবাজারের নিজ বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মুক্তিযুদ্ধের সময় কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে। এরপর সাজানো মিথ্যা সাক্ষীর মাধ্যমে ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় বিতর্কিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের ২৮ জানুয়ারি আপিল করেন আজহারুল ইসলাম। শুনানি শেষে ২০১৯ সালের ৩১ অক্টোবর আওয়ামী লীগের তৎকালীন আপিল বিভাগ মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে। এরপর ওই রায় রিভিউ চেয়ে ২০২০ সালের ১৯ জুলাই আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময়ে পতিত আওয়ামী লীগ সরকার তাকে ফাঁসিতে ঝোলানোর সব আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছিল। যে কোনো সময় ফাঁসি কার্যকরের শঙ্কা নিয়ে কারারুদ্ধ দিন কাটাতেন তিনি। এ সময় তিনি নানা রোগে আক্রান্ত হন।

তবে চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর তার মুক্তির পথ খুলে যায়। তার মুক্তির জন্য উচ্চ আদালতে আপিলের পাশাপাশি দলের পক্ষ থেকে চলে বিভিন্ন আন্দোলন। একপর্যায়ে শুনানি শেষে গত বছরের ২৭ মে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এটিএম আজহারকে বেকসুর খালাস দেন। পরদিনই রাজধানীর শাহবাগে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিজন সেল থেকে দীর্ঘ প্রায় ১৩ বছর কারারুদ্ধ থাকার পর তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।

এদিকে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার খবরে গতকাল শুক্রবার সকাল থেকেই তার বাসায় শুভেচ্ছা জানাতে ভিড় করেন জামায়াতের নেতাকর্মী ও স্থানীয় ভোটাররা। এ সময় তিনি বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জবাসীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার প্রত্যাশার কথা জানান।

মৃত্যুদণ্ডের মুখ থেকে ফিরে সংসদে যাওয়ার সুযোগ প্রসঙ্গে তিনি আমার দেশকে বলেন, মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে আজ আমি পৃথিবীর মুখ দেখতে পাচ্ছি। নির্বাচনি এলাকার সাধারণ মানুষ আমাকে ভালোবেসে ভোট দেওয়ার কারণে বিজয় লাভ করেছি। তিনি সবাইকে নিয়ে এলাকার উন্নয়নের পাশাপাশি ইসলামের খেদমত করে বাকি জীবনটুকু অতিবাহিত করার কথা বলেন।

এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, আমার চাওয়া পাওয়ার কিছু নেই। এ আসনে আগে যারা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন, এত বিশাল ভোটের ব্যবধানে কেউ নির্বাচিত হননি। ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে এ এলাকার সর্বসাধারণ যেভাবে আমাকে সম্মান দিয়েছেন, এ সম্মানটুকু আমি রক্ষা করতে চাই। আমাকে যারা ভোট দিয়েছেন আমি তাদেরও এমপি। যারা দেননি তাদেরও এমপি, এখানে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।

কনডেম সেলে থাকার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার আমার তো ফাঁসি নির্ধারিত করে রেখেছিল। বাড়ির পাশে কবর কোথায় হবে, সেটিও প্রশাসনের লোকজন নির্ধারণ করে দিয়েছিল। মহান আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন হয়তো আমার হাত দিয়ে ভালো কিছু করিয়ে নেবেন।

আজহার বলেন, আমি ১৪ বছর জেলখানায় থাকার আগে এ এলাকার বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে মানুষের পাশে থেকে অনেক কাজ করেছি। এখন হওয়ায় কাজের পরিধি আরো বেড়েছে। সরকারি বরাদ্দের অর্থের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থান থেকে অর্থ সংগ্রহ করে বদরগঞ্জ তারাগঞ্জের উন্নয়নে ব্যয় করা হবে বলেও জানান তিনি। ভালো কাজে সহযোগিতার পাশাপাশি সবার কাছে দোয়া চান জামায়াতের এ নেতা।