ঢাকা ০৯:২৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বন্দিশালা থেকে ব্যারিস্টার আরমানের মুক্তির চেষ্টা করেছি:জেরায় রাজসাক্ষী মামুন

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৫:৫৭:৩৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ৪০ বার পড়া হয়েছে

জাতীয় ডেস্ক: র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) মহাপরিচালক থাকতে টাস্কফোর্স ইন্টারোগেশন বা টিএফআই সেলে বন্দী থাকা ব্যারিস্টার আরমানকে মুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন বলে জানিয়েছেন সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন।

গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ মানবতাবিরোধী অপরাধে শেখ হাসিনার মামলায় জেরার সময় তিনি এ কথা জানান। তাকে জেরা করছেন পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো: আমির হোসেন।

জেরায় এ মামলায় আসামি থেকে রাজসাক্ষী হওয়া মামুনকে উদ্দেশ্য করে আমির হোসেন বলেন, ‘যখন র‌্যাব পরিচালিত টিএফআই সেলে ব্যারিস্টার আরমানকে আটকের বিষয়ে জানতে পেরেছেন, তখন কোনো ব্যবস্থা নিয়েছেন কি না।’ জবাবে মামুন বলেন, ‘আমি র‌্যাবের বন্দিশালায় আটক ব্যারিস্টার আরমানকে মুক্ত করা বা আইনি সমাধানের জন্য চেষ্টা করেছি। তবে কোনো ব্যবস্থা করতে পারিনি।’

এর আগে রাজসাক্ষীর জবানবন্দিতে ব্যারিস্টার আরমানের গুম ও টিএফআই সেলে আটক রাখার বিষয়ে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তিনি বলেন, ব্যারিস্টার আরমানের বিষয়টি তিনি জানতেন।

তিনি বলেন, কাউকে উঠিয়ে আনা, গুম করে রাখার মতো বিষয়গুলো তারিক সিদ্দিক সরাসরি গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতেন। এ ব্যাপারে পুলিশের আইজি হওয়া সত্ত্বেও আমাকে সব কিছু অবহিত করা হতো না।

জবানবন্দিতে মামুন বলেন, সিরিয়াস নির্দেশনাগুলো সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে আসত বলে শুনেছি। আমার সময় আমি এ ধরনের আদেশ পাই নাই। কিছু কিছু নির্দেশনা নিরাপত্তা ও সাবেক সামরিক উপদেষ্টা তারিক সিদ্দিকির পক্ষ থেকে আসতো বলে জানতে পারি। র‌্যাব যদিও পুলিশের আইজির অধীনে ছিল কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চেইন অব কমান্ড মানা হতো না এবং র‌্যাবের প্রধানরা আইজিপিকে উপেক্ষা করেই কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর দফতরের নির্দেশে কাজ করতেন।

তিনি বলেন, আমি যত দিন র‌্যাবের মহাপরিচালক ছিলাম চেষ্টা করেছি সিরিয়াস বিষয়গুলো আইজিকে অবহিত রাখতে। টিএফআই সেলে কতজন বন্দী আসত বা কারাবন্দী আছে এসব বিষয়ে সব কিছু আমাকে জানানো হতো না। এসব বিষয় র‌্যাবের ডিরেক্টর (ইন্টেলিজেন্স) দেখভাল করতেন। ব্যারিস্টার আরমান টিএফআই সেলে বন্দী আছে, এ বিষয়টি আমি জানতাম। তবে তাকে আমার সময় তুলে আনা হয়নি। অনেক আগে তুলে আনা হয়। আমার পূর্ববর্তী ডিজি বেনজির আহমেদ র‌্যাবের দায়িত্ব হস্তান্তরকালে ব্যারিস্টার আরমান যে টিএফআইতে আটক আছেন তা আমাকে অবহিত করেন।

‘অনাগ্রহ’ থাকলেও আমাকে ফের আইজিপি করা হয় : জেরার সময় চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, অবসরে যাওয়ার কথা থাকলেও আইজিপি হিসেবে দেড় বছর মেয়াদ বাড়ানো হয়। নিজের সম্মতিতে দেড় বছরের চুক্তিতে এ নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু দ্বিতীয়বার মেয়াদ বাড়ানোর সময় অনাগ্রহী ছিলেন তিনি। এমনকি জ্যেষ্ঠতার বিবেচনায় অন্য কাউকে আইজিপির পদে বসানোর কথা জানান। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিবকে নিজের অনাগ্রহের কথা জানালেও গোপালগঞ্জ কেন্দ্রিক দ্বন্দ্বের কারণে তাকে আবারো আইজিপি বানানো হয়।

মামুনের উদ্দেশে আইনজীবী আমির হোসেন বলেন, তদবির করে আপনি আইজিপি হিসেবে এক্সটেনশন নিয়েছেন। জবাবে সত্য নয় বলে জানান এ মামলায় আসামি থেকে রাজসাক্ষী হওয়া মামুন।

পাল্টা প্রশ্নে মেয়াদ বাড়ানোর সময় তিনি কোনো আপত্তি জানিয়েছিলেন কি না; এমন কথা জানতে চাইলে অবসরের পরও দু’বার আইজিপি হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ব্যাখ্যা তুলে ধরেন চৌধুরী মামুন।

জেরায় তিনি বলেন, ছাত্রজীবনে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সাথে আমি যুক্ত ছিলাম। আমার বাবা দীর্ঘকাল শাল্লা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। আমার ছোট ভাইও একই রাজনীতির সাথে জড়িত। এ ছাড়া ২০১৮ সালের নির্বাচন ঘিরে ভোট কারচুপি কিংবা অনিয়মের কারণে অন্য সব পুলিশ কর্মকর্তার সাথে আমিও পদক পেয়েছি। তবে ঠিক কী কারণে পেয়েছি তা এ মুহূর্তে বলতে পারব না। তবে এর আগে-পরেও দু’বার পদক পেয়েছি।

এ দিন বেলা সাড়ে ১১টার পর থেকে আইজিপি মামুনকে জেরা করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো: আমির হোসেন। দুপুর সোয়া ১ টার পর কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে আড়াইটা থেকে ফের জেরা শুরু হয়ে বিকেল প্রায় ৫টা পর্যন্ত চলে। পরে প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ মামলায় পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করা হয়।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করছেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। সাথে রয়েছেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম, ফারুক আহাম্মদ, তারেক আবদুল্লাহ, আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অন্যরা। এর আগে, ২ সেপ্টেম্বর জবানবন্দী শেষে মামুনকে আংশিক জেরা করেন আইনজীবী আমির হোসেন। এরপর ৩ সেপ্টেম্বর স্টেট ডিফেন্সের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাকি জেরার জন্য বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করা হয়েছিল।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

বন্দিশালা থেকে ব্যারিস্টার আরমানের মুক্তির চেষ্টা করেছি:জেরায় রাজসাক্ষী মামুন

আপডেট সময় : ০৫:৫৭:৩৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫

জাতীয় ডেস্ক: র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) মহাপরিচালক থাকতে টাস্কফোর্স ইন্টারোগেশন বা টিএফআই সেলে বন্দী থাকা ব্যারিস্টার আরমানকে মুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন বলে জানিয়েছেন সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন।

গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ মানবতাবিরোধী অপরাধে শেখ হাসিনার মামলায় জেরার সময় তিনি এ কথা জানান। তাকে জেরা করছেন পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো: আমির হোসেন।

জেরায় এ মামলায় আসামি থেকে রাজসাক্ষী হওয়া মামুনকে উদ্দেশ্য করে আমির হোসেন বলেন, ‘যখন র‌্যাব পরিচালিত টিএফআই সেলে ব্যারিস্টার আরমানকে আটকের বিষয়ে জানতে পেরেছেন, তখন কোনো ব্যবস্থা নিয়েছেন কি না।’ জবাবে মামুন বলেন, ‘আমি র‌্যাবের বন্দিশালায় আটক ব্যারিস্টার আরমানকে মুক্ত করা বা আইনি সমাধানের জন্য চেষ্টা করেছি। তবে কোনো ব্যবস্থা করতে পারিনি।’

এর আগে রাজসাক্ষীর জবানবন্দিতে ব্যারিস্টার আরমানের গুম ও টিএফআই সেলে আটক রাখার বিষয়ে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তিনি বলেন, ব্যারিস্টার আরমানের বিষয়টি তিনি জানতেন।

তিনি বলেন, কাউকে উঠিয়ে আনা, গুম করে রাখার মতো বিষয়গুলো তারিক সিদ্দিক সরাসরি গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতেন। এ ব্যাপারে পুলিশের আইজি হওয়া সত্ত্বেও আমাকে সব কিছু অবহিত করা হতো না।

জবানবন্দিতে মামুন বলেন, সিরিয়াস নির্দেশনাগুলো সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে আসত বলে শুনেছি। আমার সময় আমি এ ধরনের আদেশ পাই নাই। কিছু কিছু নির্দেশনা নিরাপত্তা ও সাবেক সামরিক উপদেষ্টা তারিক সিদ্দিকির পক্ষ থেকে আসতো বলে জানতে পারি। র‌্যাব যদিও পুলিশের আইজির অধীনে ছিল কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চেইন অব কমান্ড মানা হতো না এবং র‌্যাবের প্রধানরা আইজিপিকে উপেক্ষা করেই কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর দফতরের নির্দেশে কাজ করতেন।

তিনি বলেন, আমি যত দিন র‌্যাবের মহাপরিচালক ছিলাম চেষ্টা করেছি সিরিয়াস বিষয়গুলো আইজিকে অবহিত রাখতে। টিএফআই সেলে কতজন বন্দী আসত বা কারাবন্দী আছে এসব বিষয়ে সব কিছু আমাকে জানানো হতো না। এসব বিষয় র‌্যাবের ডিরেক্টর (ইন্টেলিজেন্স) দেখভাল করতেন। ব্যারিস্টার আরমান টিএফআই সেলে বন্দী আছে, এ বিষয়টি আমি জানতাম। তবে তাকে আমার সময় তুলে আনা হয়নি। অনেক আগে তুলে আনা হয়। আমার পূর্ববর্তী ডিজি বেনজির আহমেদ র‌্যাবের দায়িত্ব হস্তান্তরকালে ব্যারিস্টার আরমান যে টিএফআইতে আটক আছেন তা আমাকে অবহিত করেন।

‘অনাগ্রহ’ থাকলেও আমাকে ফের আইজিপি করা হয় : জেরার সময় চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, অবসরে যাওয়ার কথা থাকলেও আইজিপি হিসেবে দেড় বছর মেয়াদ বাড়ানো হয়। নিজের সম্মতিতে দেড় বছরের চুক্তিতে এ নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু দ্বিতীয়বার মেয়াদ বাড়ানোর সময় অনাগ্রহী ছিলেন তিনি। এমনকি জ্যেষ্ঠতার বিবেচনায় অন্য কাউকে আইজিপির পদে বসানোর কথা জানান। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিবকে নিজের অনাগ্রহের কথা জানালেও গোপালগঞ্জ কেন্দ্রিক দ্বন্দ্বের কারণে তাকে আবারো আইজিপি বানানো হয়।

মামুনের উদ্দেশে আইনজীবী আমির হোসেন বলেন, তদবির করে আপনি আইজিপি হিসেবে এক্সটেনশন নিয়েছেন। জবাবে সত্য নয় বলে জানান এ মামলায় আসামি থেকে রাজসাক্ষী হওয়া মামুন।

পাল্টা প্রশ্নে মেয়াদ বাড়ানোর সময় তিনি কোনো আপত্তি জানিয়েছিলেন কি না; এমন কথা জানতে চাইলে অবসরের পরও দু’বার আইজিপি হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ব্যাখ্যা তুলে ধরেন চৌধুরী মামুন।

জেরায় তিনি বলেন, ছাত্রজীবনে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সাথে আমি যুক্ত ছিলাম। আমার বাবা দীর্ঘকাল শাল্লা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। আমার ছোট ভাইও একই রাজনীতির সাথে জড়িত। এ ছাড়া ২০১৮ সালের নির্বাচন ঘিরে ভোট কারচুপি কিংবা অনিয়মের কারণে অন্য সব পুলিশ কর্মকর্তার সাথে আমিও পদক পেয়েছি। তবে ঠিক কী কারণে পেয়েছি তা এ মুহূর্তে বলতে পারব না। তবে এর আগে-পরেও দু’বার পদক পেয়েছি।

এ দিন বেলা সাড়ে ১১টার পর থেকে আইজিপি মামুনকে জেরা করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো: আমির হোসেন। দুপুর সোয়া ১ টার পর কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে আড়াইটা থেকে ফের জেরা শুরু হয়ে বিকেল প্রায় ৫টা পর্যন্ত চলে। পরে প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ মামলায় পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করা হয়।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করছেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। সাথে রয়েছেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম, ফারুক আহাম্মদ, তারেক আবদুল্লাহ, আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অন্যরা। এর আগে, ২ সেপ্টেম্বর জবানবন্দী শেষে মামুনকে আংশিক জেরা করেন আইনজীবী আমির হোসেন। এরপর ৩ সেপ্টেম্বর স্টেট ডিফেন্সের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাকি জেরার জন্য বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করা হয়েছিল।