ঢাকা ০৭:৩৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ৯ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৭ বছর খাইনি-এবার খাব— টেন্ডার জমা দেওয়ার সময় বিএনপি নেতা

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১১:২২:০০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ মে ২০২৫ ১০২ বার পড়া হয়েছে
স্টাফ রিপোর্টার: ‘রোডসে আর টেন্ডার সাবমিট করবেন না।’ ঠিকাদার শাহজাহান আলী ফোন ধরতেই এ কথা বললেন মাহবুবুর রহমান রুবেল। শাহজাহান প্রশ্ন করলেন, ‘কেন?’ রুবেল এবার বললেন, ‘কারণ আমরা নিজেরাই খাইতে পাচ্ছি না। আমার কথা হলো, আপনি ভাই টেন্ডার-মেন্ডার দিয়েন না, আমার অনুরোধ থাকল। আমরা ১৭ বছর খাইতে পারিনি। এখন আমরা খাব।’ এমন একটি কলরেকর্ড পাওয়া গেছে।
দরপত্র জমা দিয়ে গাছ কেনায় নওগাঁর মান্দা উপজেলার ঠিকাদার শাহজাহান আলীকে এভাবেই শাসিয়েছেন রাজশাহী নগরের রাজপাড়া থানা বিএনপির সদ্য সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক রুবেল। ঠিকাদার শাহজাহান আলীও বিএনপির রাজনীতি করেন। তিনি মান্দা উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি ও ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সদস্য।

জানা গেছে, কলরেকর্ডটি গতকাল সোমবার দুপুরের। ৯ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডের ওই কথোপকথনে রুবেলকে অশ্লীল ভাষা প্রয়োগ করতেও শোনা যায়।

রুবেল ঠিকাদার শাহজাহানকে বলেন, ‘আপনি এই কাজগুলা কইরেন না, জাস্ট সমস্যা হবে।’ শাহজাহান বলেন, ‘আপনারা যদি নিষেধ করেন, তাহলে বিষয়টা কেমন হয় না?’ রুবেল বলেন, ‘এখন এমন অবস্থা হয়েছে, মান্দার লোক শুনলেই চার-পাঁচটা থাপ্পড় মারবে।’ শাহজাহান বলেন, ‘মান্দার লোক তো আরও টেন্ডার করছে।’ জবাবে রুবেল বলেন, ‘একটার পর একটা অপমান হবেই, দেখবেন। আপনাকে আমি বললাম ভাই ব্যক্তিগতভাবে। মাথায় রাইখেন।’ শাহজাহান জানতে চান, ‘কী করলে অপমান হবে না সেইটা বলেন।’ রুবেলের সাফ জবাব, ‘টেন্ডার না দিলেই অপমান হবেন না।’ ‘টেন্ডার তো হয়েই গেছে’, শাহজাহান এ কথা জানালে এরপর অশ্লীল ভাষায় কথা বলেন বিএনপি নেতা রুবেল।

তিনি বলেন, ‘আপনাকে এতবার ফোন দিলাম। আপনি ফোনই ধরেন না। তাহলে কী করব বলেন?’ শাহজাহান এ সময় ভদ্রভাবে কথা বলার অনুরোধ করেন। রুবেল বলেন, ‘আপনাকে ফোন করলাম যে এটা উইথড্র করা লাগবে, আপনি ফোনই ধরেননি।’ শাহজাহান বলেন, ‘উইথড্র কেউ না করলে আমি কেন করব ভাই?’ রুবেল বলেন, ‘এটা আমরা মীমাংসা করতাম। শোনেন ভাই, এখন ডিজিটাল যুগ। কাউকে গোপনে টাকা দিয়ে কোনো ব্যবসা হবে না। ওপেন আপনাকে আসতে হবে।’

শাহজাহান বলেন, ‘আপনি টেন্ডার করবেন, করে কাজ নিবেন আপনি।’ শাহজাহান বলেন, ‘নিজের এলাকাতে এখন কুইত্তাও ভাগ দেয় না, জানেন? কুইত্তাও বুলছে যে, তোর এলাকা তুই খা, আমার এলাকা আমি খাই।’ এ সময় শাহজাহান রুবেলের দলীয় পরিচয় জানতে চান। তখন রুবেল বলেন, ‘বিএনপির আমি সভাপতি, রাজপাড়া থানার।’ যদিও রাজপাড়া থানা বিএনপির সভাপতি মিজানুর রহমান নামের এক ব্যক্তি। রুবেল সভাপতি পরিচয় দেওয়ার পর শাহজাহান জানান, তিনিও ছাত্রজীবনে ছাত্রদল করেছেন। এখন বিএনপি করেন।

শাহজাহান বলেন, ‘আপনি বলবেন একবার, হারুন বলবে আরেকবার। আমরা কয়জনাকে টাকা দিব রে ভাই? আমি বিধি মোতাবেক কাজ পেয়েছি। আপনাদের দাবি থাকলে মানতে চেয়েছি। এখন আপনি বলছেন দেন, হারুন বলতেছে দেন। তাহলে কয়জনাকে দিব? আমার কয় টাকা লাভ হবে একটা লটে?’ রুবেল বলেন, ‘আমি টাকা চাইনি, আপনাকে আসতে বলেছিলাম।’ শাহজাহান জানতে চান, ‘তাহলে কেন ডেকেছিলেন?’ রুবেল বলেন, ‘যারা যারা পার্টি আসছে, সবার সাথে বসে একটা সিস্টেম করতাম।’

এ পর্যায়ে রুবেলের কাছ থেকে ফোন নেন হারুন, তিনি নিজেকে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি হুমায়ুন কবীর লালুর ভাই বলে পরিচয় দেন। তিনি বলেন, ‘এর পরে টেন্ডার হলে আপনি আমাদের সাথে অবশ্যই যোগাযোগ করবেন। আমাদের সাথে যোগাযোগ রেখে কাজ করবেন। আপনার ভাই আমাদের সাথে যোগাযোগ করেই টেন্ডার ড্রপ করে।’

শাহজাহান বলেন, ‘আপনার সাথে যোগাযোগ রেখেই তো করি ভাই। আমরা তো বুঝি। যে এলাকার কাজ সে এলাকার কিছু দাবি থাকে। ব্যবসা করি গোটা বাংলাদেশ, এটা আমরা বুঝি। সুতরাং, যেটাই হোক করা হবে। কারণ, আমাদের দিকেও দেখতে হবে। একটা লট পেয়েছি ১৬ বছর পর। আমি ভাই রাজশাহী কলেজ ছাত্রদলেরও শিক্ষা সম্পাদক ছিলাম। আমি আপনাদের সাথে যোগাযোগ করবই ভাই, আপনারা কোনো চিন্তা করবেন না।’

এ সময় হারুন বলেন, ‘ঈদের আর বেশি দিন নাই। আপনি আসেন, এসে আমাদের সাথে দেখা করে যান।’ শাহজাহান তখন বলেন, ‘লটটা (গাছ) আগে কাটি, তারপরে তো দুই পয়সা হবে, তাই না? কেবল তো টাকা জমার অর্ডার হলো। আপনাদের সাথে সাক্ষাৎ না করে ব্যবসা করতে পারব? ব্যবসা করলে তো লক্ষ্মীপুরে আপনাদের কাছে যেতে হবে। আমি আসব।’

হারুন বলতে থাকেন, ‘এইডা বইলেন না। সমাধান আপনাকে ঈদের আগেই করতে হবে এবং খুব তাড়াতাড়ি করতে হবে।’ শাহজাহান বলেন, ‘ঈদের আগে তো লটই কাটতে পারব না। আমাদেরও তো ঈদ-টিদ আছে, বুঝেননি?’ হারুন বলেন, ‘আপনাকে দু-এক দিনের মধ্যেই করতে হবে। সবাই (দরপত্রে গাছ কেনা অন্য ঠিকাদারেরাও) তা-ই করবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদার শাহজাহান আলী বলেন, ‘ওদের বাড়ি লক্ষ্মীপুরে। সড়ক অফিসও ওই এলাকায়। ওদের অনেক কথাই থাকে। আমাকে ফোন করে বলেছে। আমার তো কিছু করার নেই।’

বিএনপি নেতা রুবেল বলেন, ‘অনেক ছেলেপিলে থাকে। তাদেরও দাবিদাওয়া থাকে একটা কাজ হলে। কিন্তু শাহজাহান দেখা করেনি। তাই ফোন করে দুইটা কথা বলেছি। এটা ঠিক হয়নি। অডিওটা ভাই অমিট (ডিলিট) করে দেন। নিউজ-টিউজ করিয়েন না ভাই।’

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

১৭ বছর খাইনি-এবার খাব— টেন্ডার জমা দেওয়ার সময় বিএনপি নেতা

আপডেট সময় : ১১:২২:০০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ মে ২০২৫
স্টাফ রিপোর্টার: ‘রোডসে আর টেন্ডার সাবমিট করবেন না।’ ঠিকাদার শাহজাহান আলী ফোন ধরতেই এ কথা বললেন মাহবুবুর রহমান রুবেল। শাহজাহান প্রশ্ন করলেন, ‘কেন?’ রুবেল এবার বললেন, ‘কারণ আমরা নিজেরাই খাইতে পাচ্ছি না। আমার কথা হলো, আপনি ভাই টেন্ডার-মেন্ডার দিয়েন না, আমার অনুরোধ থাকল। আমরা ১৭ বছর খাইতে পারিনি। এখন আমরা খাব।’ এমন একটি কলরেকর্ড পাওয়া গেছে।
দরপত্র জমা দিয়ে গাছ কেনায় নওগাঁর মান্দা উপজেলার ঠিকাদার শাহজাহান আলীকে এভাবেই শাসিয়েছেন রাজশাহী নগরের রাজপাড়া থানা বিএনপির সদ্য সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক রুবেল। ঠিকাদার শাহজাহান আলীও বিএনপির রাজনীতি করেন। তিনি মান্দা উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি ও ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সদস্য।

জানা গেছে, কলরেকর্ডটি গতকাল সোমবার দুপুরের। ৯ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডের ওই কথোপকথনে রুবেলকে অশ্লীল ভাষা প্রয়োগ করতেও শোনা যায়।

রুবেল ঠিকাদার শাহজাহানকে বলেন, ‘আপনি এই কাজগুলা কইরেন না, জাস্ট সমস্যা হবে।’ শাহজাহান বলেন, ‘আপনারা যদি নিষেধ করেন, তাহলে বিষয়টা কেমন হয় না?’ রুবেল বলেন, ‘এখন এমন অবস্থা হয়েছে, মান্দার লোক শুনলেই চার-পাঁচটা থাপ্পড় মারবে।’ শাহজাহান বলেন, ‘মান্দার লোক তো আরও টেন্ডার করছে।’ জবাবে রুবেল বলেন, ‘একটার পর একটা অপমান হবেই, দেখবেন। আপনাকে আমি বললাম ভাই ব্যক্তিগতভাবে। মাথায় রাইখেন।’ শাহজাহান জানতে চান, ‘কী করলে অপমান হবে না সেইটা বলেন।’ রুবেলের সাফ জবাব, ‘টেন্ডার না দিলেই অপমান হবেন না।’ ‘টেন্ডার তো হয়েই গেছে’, শাহজাহান এ কথা জানালে এরপর অশ্লীল ভাষায় কথা বলেন বিএনপি নেতা রুবেল।

তিনি বলেন, ‘আপনাকে এতবার ফোন দিলাম। আপনি ফোনই ধরেন না। তাহলে কী করব বলেন?’ শাহজাহান এ সময় ভদ্রভাবে কথা বলার অনুরোধ করেন। রুবেল বলেন, ‘আপনাকে ফোন করলাম যে এটা উইথড্র করা লাগবে, আপনি ফোনই ধরেননি।’ শাহজাহান বলেন, ‘উইথড্র কেউ না করলে আমি কেন করব ভাই?’ রুবেল বলেন, ‘এটা আমরা মীমাংসা করতাম। শোনেন ভাই, এখন ডিজিটাল যুগ। কাউকে গোপনে টাকা দিয়ে কোনো ব্যবসা হবে না। ওপেন আপনাকে আসতে হবে।’

শাহজাহান বলেন, ‘আপনি টেন্ডার করবেন, করে কাজ নিবেন আপনি।’ শাহজাহান বলেন, ‘নিজের এলাকাতে এখন কুইত্তাও ভাগ দেয় না, জানেন? কুইত্তাও বুলছে যে, তোর এলাকা তুই খা, আমার এলাকা আমি খাই।’ এ সময় শাহজাহান রুবেলের দলীয় পরিচয় জানতে চান। তখন রুবেল বলেন, ‘বিএনপির আমি সভাপতি, রাজপাড়া থানার।’ যদিও রাজপাড়া থানা বিএনপির সভাপতি মিজানুর রহমান নামের এক ব্যক্তি। রুবেল সভাপতি পরিচয় দেওয়ার পর শাহজাহান জানান, তিনিও ছাত্রজীবনে ছাত্রদল করেছেন। এখন বিএনপি করেন।

শাহজাহান বলেন, ‘আপনি বলবেন একবার, হারুন বলবে আরেকবার। আমরা কয়জনাকে টাকা দিব রে ভাই? আমি বিধি মোতাবেক কাজ পেয়েছি। আপনাদের দাবি থাকলে মানতে চেয়েছি। এখন আপনি বলছেন দেন, হারুন বলতেছে দেন। তাহলে কয়জনাকে দিব? আমার কয় টাকা লাভ হবে একটা লটে?’ রুবেল বলেন, ‘আমি টাকা চাইনি, আপনাকে আসতে বলেছিলাম।’ শাহজাহান জানতে চান, ‘তাহলে কেন ডেকেছিলেন?’ রুবেল বলেন, ‘যারা যারা পার্টি আসছে, সবার সাথে বসে একটা সিস্টেম করতাম।’

এ পর্যায়ে রুবেলের কাছ থেকে ফোন নেন হারুন, তিনি নিজেকে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি হুমায়ুন কবীর লালুর ভাই বলে পরিচয় দেন। তিনি বলেন, ‘এর পরে টেন্ডার হলে আপনি আমাদের সাথে অবশ্যই যোগাযোগ করবেন। আমাদের সাথে যোগাযোগ রেখে কাজ করবেন। আপনার ভাই আমাদের সাথে যোগাযোগ করেই টেন্ডার ড্রপ করে।’

শাহজাহান বলেন, ‘আপনার সাথে যোগাযোগ রেখেই তো করি ভাই। আমরা তো বুঝি। যে এলাকার কাজ সে এলাকার কিছু দাবি থাকে। ব্যবসা করি গোটা বাংলাদেশ, এটা আমরা বুঝি। সুতরাং, যেটাই হোক করা হবে। কারণ, আমাদের দিকেও দেখতে হবে। একটা লট পেয়েছি ১৬ বছর পর। আমি ভাই রাজশাহী কলেজ ছাত্রদলেরও শিক্ষা সম্পাদক ছিলাম। আমি আপনাদের সাথে যোগাযোগ করবই ভাই, আপনারা কোনো চিন্তা করবেন না।’

এ সময় হারুন বলেন, ‘ঈদের আর বেশি দিন নাই। আপনি আসেন, এসে আমাদের সাথে দেখা করে যান।’ শাহজাহান তখন বলেন, ‘লটটা (গাছ) আগে কাটি, তারপরে তো দুই পয়সা হবে, তাই না? কেবল তো টাকা জমার অর্ডার হলো। আপনাদের সাথে সাক্ষাৎ না করে ব্যবসা করতে পারব? ব্যবসা করলে তো লক্ষ্মীপুরে আপনাদের কাছে যেতে হবে। আমি আসব।’

হারুন বলতে থাকেন, ‘এইডা বইলেন না। সমাধান আপনাকে ঈদের আগেই করতে হবে এবং খুব তাড়াতাড়ি করতে হবে।’ শাহজাহান বলেন, ‘ঈদের আগে তো লটই কাটতে পারব না। আমাদেরও তো ঈদ-টিদ আছে, বুঝেননি?’ হারুন বলেন, ‘আপনাকে দু-এক দিনের মধ্যেই করতে হবে। সবাই (দরপত্রে গাছ কেনা অন্য ঠিকাদারেরাও) তা-ই করবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদার শাহজাহান আলী বলেন, ‘ওদের বাড়ি লক্ষ্মীপুরে। সড়ক অফিসও ওই এলাকায়। ওদের অনেক কথাই থাকে। আমাকে ফোন করে বলেছে। আমার তো কিছু করার নেই।’

বিএনপি নেতা রুবেল বলেন, ‘অনেক ছেলেপিলে থাকে। তাদেরও দাবিদাওয়া থাকে একটা কাজ হলে। কিন্তু শাহজাহান দেখা করেনি। তাই ফোন করে দুইটা কথা বলেছি। এটা ঠিক হয়নি। অডিওটা ভাই অমিট (ডিলিট) করে দেন। নিউজ-টিউজ করিয়েন না ভাই।’