রাজশাহীতে লোডশেডিং বিপর্যস্ত জনজীবন
- আপডেট সময় : ০৩:৪৮:৫৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় দৈনন্দিন কাজকর্মে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে। শহরাঞ্চলে তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম হলেও গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা আরো ভয়াবহ, যা অনেক ক্ষেত্রে ৯ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু ও বয়স্কদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে মশার উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। অনেক এলাকায় পানির সংকটও দেখা দিয়েছে, কারণ বৈদ্যুতিক পাম্প চালানো সম্ভব না হওয়ায় নিয়মিত পানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
এসএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। শেষ মুহূর্ত এবং পরীক্ষা চলাকালীন বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা তাদের পড়াশোনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পবা উপজেলার নওহাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের পরীক্ষার্থী শামিম আহম্মেদ জানায়, পড়তে বসলেই বিদ্যুৎ চলে যায়। গরমে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে, আবার আলো না থাকায় পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াও সম্ভব হয় না। এতে করে প্রস্তুতিতে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। অভিভাবকরাও একইভাবে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। তাদের অভিযোগ, রাতেও ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় সন্তানরা ঠিকমতো ঘুমাতে পারছে না, ফলে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে পরীক্ষার ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে কৃষি খাতে। রাজশাহীর তানোর, পবা, গোদাগাড়ী, দুর্গাপুর ও মোহনপুরসহ বিভিন্ন উপজেলার কৃষকরা মারাত্মক সেচ সংকটে পড়েছেন। ফলে বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসল ঝুঁকির মুখে রয়েছে। তানোর উপজেলার কৃষক নাজিম উদ্দিন জানান, দিনের বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকে না, আর এলেও তা ১৫ থেকে ২০ মিনিটের বেশি স্থায়ী হয় না। এতে সেচ কার্যক্রম চালানো কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পবা উপজেলার আফিপাড়া এলাকার পাট চাষি মাইনুল ইসলাম বলেন, দুই বিঘা জমিতে পানি দিতে স্বাভাবিক সময় যেখানে সর্বোচ্চ দেড় ঘণ্টা লাগে, সেখানে বিদ্যুতের লুকোচুরির কারণে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সময় লেগেছে। এতে শ্রম ও খরচ দুটোই বেড়ে গেছে।
গোদাগাড়ীর কৃষক শাহজাহান আলী জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় অনেকেই বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত পাম্প ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন, কিন্তু ডিজেলের সরবরাহও সহজলভ্য নয়। কোনোভাবে সেচ দিলেও খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে, যা তাদের জন্য বড় আর্থিক চাপ তৈরি করছে। মোহনপুরের কৃষক সায়েদুর আলী বলেন, তীব্র গরমে জমির মাটি ফেটে যাচ্ছে এবং পানির অভাবে ফসল বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
শুধু কৃষি খাতেই নয়, লোডশেডিংয়ের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শিল্প ও ব্যবসা খাতেও। রাজশাহী মহানগরের এক মুদ্রণ ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম জানান, বিদ্যুৎ না থাকলে তার ব্যবসার সব কাজ বন্ধ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে জেনারেটর চালাতে হয়, যা অতিরিক্ত খরচের বোঝা তৈরি করছে। সাহেববাজারের ব্যবসায়ী নওসাদ আলী বলেন, ফ্রিজে সংরক্ষিত পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তীব্র গরমের কারণে ক্রেতার উপস্থিতিও কমে গেছে, ফলে বিক্রি কমে যাচ্ছে। বিসিক শিল্প এলাকার এক উদ্যোক্তা সাহেব আলী জানান, দিনের পর দিন উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
নগর ও গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও সীমাহীন হয়ে উঠেছে। বাঘা উপজেলার মনিগ্রাম এলাকার বাসিন্দা সাদেক আলী বলেন, দিন-রাত মিলিয়ে বেশিরভাগ সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না। এতে ঘুম থেকে শুরু করে দৈনন্দিন সব কাজ ব্যাহত হচ্ছে। নওহাটা পৌরসভার গৃহিণী নারগিস বেগম বলেন, এক সময় লোডশেডিং অতীতের বিষয় হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু এখন আবার সেই দুর্ভোগ ফিরে এসেছে।
এদিকে, মাঠপর্যায়ে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি থাকলেও বিদ্যুৎ বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বক্তব্যে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। রাজশাহী নেসকো এবং পল্লী বিদ্যুতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের অভিযোগ মানতে নারাজ। তাদের দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং লোডশেডিং খুবই সামান্য।
নেসকো রাজশাহী কার্যালয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান জানান, বর্তমানে রাজশাহীতে বিদ্যুতের মোট চাহিদা ৪৭০ মেগাওয়াট। তিনি দাবি করেন, চাহিদা পূরণের পরও ১৬ থেকে ১৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত থাকছে। ফলে বড় ধরনের লোডশেডিং হওয়ার কথা নয়, আর যা হচ্ছে তা খুব অল্প সময়ের জন্য। গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে তারা কাজ করে যাচ্ছেন বলেও তিনি জানান।
অন্যদিকে, রাজশাহী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার রমেন্দ্র চন্দ্র রায় লোডশেডিংয়ের বিষয়টি স্বীকার করলেও তা অল্প বলে উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পল্লী বিদ্যুতের ১০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ লোডশেডিং চলছে, যা একটি সাময়িক সমস্যা এবং দ্রুতই পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ (বাঘা জোনাল অফিস)-এর ডিজিএম মনিরুল ইসলাম জানান, বিদ্যুতের সুষম বণ্টনের জন্য তার আওতাধীন আড়ানী, জোতরাঘব ও চকরাজাপুর উপকেন্দ্রের ১৫টি ফিডারের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে সরবরাহ করা হচ্ছে। যতটুকু বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে, তা সবার মাঝে ভাগ করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
তবে বিদ্যুৎ বিভাগের এসব আশ্বাসের পরও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ দ্রুত এই সংকট নিরসনের দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে, স্থানীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।




















