‘আমি মরি নাই’, নিজেকে জুলাই শহীদ দেখে সাংবাদিক সোহেল
- আপডেট সময় : ১২:৪৮:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬ ২৭ বার পড়া হয়েছে
এর আগে সোমবার সকাল থেকে নিজের পরিচিতজন, সহকর্মী ও সাংবাদিকদের একের পর এক ফোন পেতে থাকেন তিনি। এছাড়া মিজানুর রহমান সোহেলের বাসায় তার আত্মীয় স্বজনসহ শুভানুদ্ধায়ীরা ফোন করে অনেকে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জানতে চান, তিনি বেঁচে আছেন কি না।
এর কারণ হিসেবে সোহেল জানান, ঢাকার হোটেল ওয়েস্টিনে অনুষ্ঠিত একটি অনুষ্ঠানে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একটি প্রেজেন্টেশনে তাকে ২০২৪ সালের ৪ জুলাই হবিগঞ্জে ‘শহীদ’ সাংবাদিক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে সেখানে যে নাম ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি সাংবাদিক সোহেল আকাঞ্জির। আর সেই নামের সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে মিজানুর রহমান সোহেলের ছবি।
এদিকে সোমবার সকাল ১০টায় রাজধানীর গুলশানের হোটেল ওয়েস্টিনের বলরুমে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানটিতে হবিগঞ্জে সেই ‘শহীদ’ সোহেল আকাঞ্জির বদলে উপস্থাপিত সাংবাদিক মিজানুর রহমান সোহেলের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ইতোমধ্যে ভাইরাল।
বিষয়টি জানার পর বিস্ময় ও হতাশা প্রকাশ করে সোহেল পোস্টে বলেন, একজন মানুষ জীবিত থাকা অবস্থায় তাকে মৃত বা শহীদ হিসেবে উপস্থাপন করা কোনো সাধারণ তথ্যগত ভুল নয়। এটি একজন মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও পেশাগত পরিচয়ের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তিনি বলেন, বিষয়টি কোনো ব্যক্তিগত আলাপচারিতা বা অনানুষ্ঠানিক পোস্টে ঘটেনি। বরং একটি প্রকাশ্য অনুষ্ঠানের প্রেজেন্টেশনে এমন তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রে বলা হয়েছিল, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার তুমুল লড়াই চলাকালে ফ্যাসিস্টদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাংবাদিকেরা কাজ করেছেন। দেশ-বিদেশের মানুষের সামনে সত্য তথ্য তুলে ধরেছেন।’
সোহেল বলেন, সাংবাদিকদের সাহস, ভূমিকা ও আত্মত্যাগ স্মরণে এমন আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সত্য তথ্য তুলে ধরার কথা বলা একটি অনুষ্ঠানের প্রেজেন্টেশনেই একজন জীবিত সাংবাদিককে শহীদ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এটিকে শুধু তথ্যগত ভুল হিসেবে দেখার সুযোগ আছে কি না, সে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, একজন সাংবাদিকের নামের সঙ্গে ছবি যুক্ত করার আগে ছবিটি কার, নামটি কার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জীবিত না মৃত—এসব তথ্য অন্তত একবার যাচাই করা হয়েছিল কি না। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের মতো স্পর্শকাতর একটি বিষয় হওয়ায় তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্ব আরও বেশি ছিল বলে মনে করেন তিনি।
সাংবাদিক সোহেল বলেন, ‘একজন সাংবাদিকের ছবি সংগ্রহ, সেটি কোনো উপস্থাপনায় ব্যবহার এবং তার সঙ্গে একজন শহীদের পরিচয় যুক্ত করার পুরো প্রক্রিয়ায় কারও মনে একবারও প্রশ্ন জাগেনি যে তথ্যটি সঠিক কি না। ভেরিফিকেশন কি এতটাই কঠিন ছিল?’
তিনি জানান, অনুষ্ঠানস্থল থেকেই প্রথম কয়েকজন সাংবাদিক তাকে ফোন করেন। শুরুতে বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেননি। ভেবেছিলেন, হয়তো কোনো ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। কিন্তু পরে ফোনের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে সোহেল বলেন, তিনি জুলাই আন্দোলনে শহীদ হননি এবং ২০২৪ সালের ৪ জুলাই হবিগঞ্জেও মারা যাননি। তিনি জীবিত আছেন এবং এখনো লিখছেন ও মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন। তিনি আরও বলেন, একটি ভুল তথ্য, একটি ভুল ছবি ও একটি ভুল উপস্থাপনা মুহূর্তের মধ্যে একজন জীবিত মানুষকে অন্যদের কাছে ‘মৃত’ বানিয়ে দিতে পারে।
এ ধরনের ভুল তথ্যের সামাজিক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন সোহেল জানান, কেউ তথ্যটি বিশ্বাস করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে পারেন, আবার কেউ তার পরিবারের সদস্য বা পরিচিতজনদের কাছে শোকবার্তাও পাঠাতে পারেন। এতে একজন সাংবাদিকের পরিচয় ও পেশাগত বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এই ভুলের দায় কার? এমন প্রশ্ন তুলে সোহেল জানতে চান, তথ্য সংগ্রহ করেছেন কারা, নাম ও ছবি মিলিয়েছেন কারা, প্রেজেন্টেশন তৈরি ও যাচাই করেছেন কারা এবং কার অনুমোদনের পর এটি প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে কাউকে অযথা অভিযুক্ত করতে চান না জানিয়ে তিনি বলেন, তিনি শুধু দায়িত্বশীল ব্যাখ্যা ও সংশোধন চান।
নিজের করণীয় নিয়েও কথা বলেছেন সোহেল। তিনি বলেন, প্রথম মুহূর্তে আমি করবো তা বুঝতে পারেননি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, চুপ করে থাকার সুযোগ নেই। কারণ, সোমবারই আমাকে কয়েকজন ফোন করে জানতে চেয়েছেন যে, আমি বেঁচে আছেন কি না। এই ভুল তথ্য পরদিন আরও কত মানুষের কাছে পৌঁছাবে, তা আমি জানি না।
পোস্টে তিনি জানান, নিজের প্রচারের জন্য নয়, তথ্যটি পরিষ্কার করার জন্যই তিনি ফেসবুকে এই পোস্ট দিয়েছেন।




















