কুরআন ও সহীহ হাদীস কি পরস্পর সাংঘর্ষিক হতে পারে? একটি সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ, পুনর্মূল্যায়ন ও সমন্বয়
- আপডেট সময় : ১০:৫১:০৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬ ৫১ বার পড়া হয়েছে
ড.এম. মোস্তফা মুসা: সারসংক্ষেপ: কুরআনে একাধিক স্থানে মক্কার মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে “মাসহূর” (যাদুগ্রস্ত) বলে অপবাদ দিয়েছিল এবং আল্লাহ তাদের এ বক্তব্যকে জুলুম, মিথ্যাচার ও বিভ্রান্তি হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছেন (সূরা আল-ইসরা ১৭:৪৭; সূরা আল-ফুরকান ২৫:৮)। অপরদিকে সহীহ আল-বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি সুপরিচিত হাদীসে এসেছে যে, এক সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ওপর লাবীদ ইবনুল আ’সাম নামক এক ব্যক্তি যাদু করেছিল, যার ফলে তিনি কিছু ব্যক্তিগত বিষয়ে সাময়িকভাবে এমন অনুভব করতেন যে তিনি কোনো কাজ করেছেন, অথচ বাস্তবে তা করেননি; পরে আল্লাহ তাঁকে সেই ঘটনা অবহিত করেন এবং তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন (সহীহ বুখারী: ৫৭৬৫/৬৩৯১; সহীহ মুসলিম: ২১৮৯)।
প্রথম দৃষ্টিতে এই দুই বর্ণনার মধ্যে আপাত বিরোধ (Apparent Contradiction) অনুভূত হতে পারে। বিশেষত কিছু দ্বীনি ভাই দাবি করেন যে, যদি কুরআন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে “যাদুগ্রস্ত” হওয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে থাকে, তবে যাদুর ঘটনার হাদীস গ্রহণ করলে হাদীসের রাবী এবং মুহাদ্দিসদেরও “জালিম” বলতে হবে।
এই গবেষণার উদ্দেশ্য কোনো মতবাদকে সমর্থন বা খণ্ডন করা নয়; বরং কুরআন, সহীহ হাদীস, তাফসীর, উসূলুল ফিকহ, ইসলামী আইন, নৈতিকতা, দর্শন এবং ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বের আলোকে দলিলসমূহের সমন্বিত মূল্যায়ন করা। প্রবন্ধটি দেখানোর চেষ্টা করবে যে, কুরআন যে অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং হাদীসে যে ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে, উভয়ের বিষয়বস্তু (Subject Matter) ও উদ্দেশ্য (Purpose) একই কি না, নাকি তারা ভিন্ন বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা করছে।
১. ভূমিকা: কুরআন ইসলামের সর্বোচ্চ ওহী এবং সর্বশেষ নির্ভুল দলিল। সুন্নাহ কুরআনের ব্যাখ্যা, প্রয়োগ ও বাস্তব রূপ। ইসলামী আকীদার মৌলিক নীতি হলো, সুন্নাহ কখনো কুরআনের বিরোধিতা করতে পারে না। ফলে প্রকৃত অর্থে কুরআন ও সুন্নাহর মধ্যে মৌলিক সাংঘর্ষিকতা থাকা ইসলামী মূলনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তবে ভাষা, প্রসঙ্গ, উদ্দেশ্য, বা ব্যাখ্যার সীমাবদ্ধতার কারণে আপাত মনে হবে, ‘কুরআন ও সুন্নাহর মধ্যে বিরোধ (Apparent Tension) সৃষ্টি হয়েছে’। তবে ইতিহাসে বহুবার এমন কিছু হাদীস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যেগুলো প্রথম দৃষ্টিতে কুরআনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে হয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ওপর যাদুর প্রভাব সম্পর্কিত হাদীস সেই বিতর্কিত উদাহরণগুলোর অন্যতম।
কুরআনে মুশরিকরা বলেছিল: ( اِذْ يَقُوْلُ الظّٰلِمُوْنَ اِنْ تَتَّبِعُوْنَ اِلَّا رَجُلًا مَّسْحُوْرًا); যালিমরা বলে, ‘তোমরা তো এমন একজন ব্যক্তিরই অনুসরণ করছ, যিনি যাদুগ্রস্ত’। (সূরা আল-ইসরা, ১৭:৪৭; সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৮)। অন্যদিকে সহীহ বুখারী এবং সহীহ মুসলিমে এসেছে: (سُحِرَ النَّبِيُّ ﷺ); “নবী (ﷺ)-এর ওপর যাদু করা হয়েছিল।” (সহীহ বুখারী: ৫৭৬৫/৬৩৯১; সহীহ মুসলিম: ২১৮৯) এই দুই বক্তব্য কি একই অর্থ বহন করে? নাকি একটি হচ্ছে অবিশ্বাসীদের আকীদাগত অপবাদ, আর অন্যটি একটি ঐতিহাসিক চিকিৎসাগত ঘটনা? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই এই গবেষণার উদ্দেশ্য।
আলোচ্য বিষয়ে প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি কেবল একটি হাদীসের অর্থ নয়; বরং নবীর ইসমত (গুনাহমুক্ত), ওহীর নির্ভরযোগ্যতা এবং ইসলামী আকীদার ভিত্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই গবেষণার মূল প্রশ্ন তিনটি: (ক). কুরআন কোন অভিযোগকে প্রত্যাখ্যান করেছে? (খ). সহীহ বুখারীর হাদীসটি ঠিক কী বলছে? (গ). উভয় বক্তব্য কি একই বিষয়ে কথা বলছে, নাকি ভিন্ন প্রসঙ্গকে নির্দেশ করছে?
২. কুরআনের অবস্থান: কুরআনে “মাসহূর” (মন্ত্রবশীভূত বা যাদুগ্রস্ত) শব্দটি এমন এক অভিযোগ হিসেবে এসেছে, যার মাধ্যমে মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নবুওয়াতকে অস্বীকার করতে চেয়েছিল। আল্লাহ বলেন: (نَّحْنُ أَعْلَمُ بِمَا يَسْتَمِعُونَ بِهِ إِذْ يَسْتَمِعُونَ إِلَيْكَ… إِذْ يَقُولُ الظَّالِمُونَ إِن تَتَّبِعُونَ إِلَّا رَجُلًا مَّسْحُورًا); যখন তারা কান পেতে তোমার কথা শুনে, তখন তারা কেন কান পেতে শুনে তা আমরা ভালো জানি এবং এটাও জানি, গোপনে আলোচনাকালে যালিমরা বলে, ‘তোমরা তো এমন একজন লোকেরই অনুসরণ করছ, যিনি যাদুগ্রস্ত’। (সূরা আল-ইসরা ১৭:৪৭)। আল্লাহ বলেন: (وَقَالَ الظَّالِمُونَ إِن تَتَّبِعُونَ إِلَّا رَجُلًا مَّسْحُورًا), ” যালিমরা বলে, তোমরা তো কেবল এমন একজন লোকের অনুসরণ করছ, যিনি যাদুগ্রস্ত।” (সূরা আল-ফুরকান ২৫:৮)। এরপর আল্লাহ বলেন: (انظُرْ كَيْفَ ضَرَبُوا لَكَ الْأَمْثَالَ فَضَلُّوا), “দেখ, তারা তোমার সম্পর্কে কেমন উপমা দাঁড় করিয়েছে; ফলে তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে, অতঃপর তারা পথ পাবে না”। (সূরা আল-ফুরকান ২৫:৯)।
এখানে লক্ষ্যণীয় যে, কুরআনের আলোচ্য বিষয় হলো নবুওয়াত অস্বীকার করার উদ্দেশ্যে করা একটি অপবাদ। মুশরিকদের বক্তব্য ছিল: (ক). মুহাম্মদ (ﷺ)-এর ওপর নাযিল হওয়া ওহী সত্য নয়; (খ). তিনি মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন; (গ). তাঁর বক্তব্য যাদুর প্রভাবে এসেছে; (ঘ). অতএব তাঁর অনুসরণ করা যাবে না। অর্থাৎ “মাসহূর” শব্দটি এখানে একটি নবুওয়াতবিরোধী ধর্মতাত্ত্বিক অপবাদ (Theological Accusation), অর্থাৎ নবুওয়াতকে অবৈধ প্রমাণ করার অপবাদ, যাতে সাধারণ মুশরিকরা মুহাম্মদ (ﷺ)-কে অনুসরণ না করে এবং ইসলামে দীক্ষিত না হয় । অন্যদিকে কুরআন বহু জায়গায় ঘোষণা করেছে যে আল্লাহ তাঁর রাসূলকে ওহী পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ হেফাজত করেছেন।
আল্লাহ বলেন, (وَاللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ), “আল্লাহ আপনাকে মানুষের (ক্ষতি) থেকে রক্ষা করবেন।” (সূরা মায়িদা, ৫:৬৭)। আবার (مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوَىٰ), “তোমাদের সঙ্গী (মুহাম্মদ) পথভ্রষ্ট হননি এবং বিভ্রান্তও হননি।” (সূরা আন-নাজম, ৫৩:২); এবং (وَمَا يَنطِقُ عَنِ الْهَوَىٰ إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَىٰ), “তিনি নিজের প্রবৃত্তি থেকে কথা বলেন না; এটি তো কেবল ওহী।” (সূরা আন-নাজম, ৫৩:৩–৪)। অতএব কুরআনের সুস্পষ্ট অবস্থান হলো: (ক). রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নবুওয়াত যাদুর ফল নয়। (খ). ওহী কখনো যাদুর দ্বারা বিকৃত হয়নি। (গ). আল্লাহ তাঁর রাসূলকে ওহী প্রচারে পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়েছেন। (ঘ). “মাসহূর” বলা ছিল অবিশ্বাসীদের ইচ্ছাকৃত অপবাদ।
এই আয়াতগুলোর ভাষা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মুশরিকরা বলতে চেয়েছিল, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নবুওয়ত, কুরআন, বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা এবং ওহী, সবই জাদুর প্রভাবে বিকৃত। অর্থাৎ তারা পুরো নবুওয়তকেই অস্বীকার করছিল। আল্লাহ এই অভিযোগকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অতএব কুরআনের আলোচ্য বিষয়, নবুওয়তের সত্যতা।
৩. সহীহ হাদীসের অবস্থান: সহীহ আল-বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে: “রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ওপর যাদু করা হয়েছিল; এমনকি তাঁর কাছে কখনো কখনো মনে হতো যে তিনি কোনো কাজ করেছেন, অথচ বাস্তবে তা করেননি।” (সহীহ বুখারী: ৫৭৬৫/৬৩৯১; সহীহ মুসলিম: ২১৮৯)। হাদীসে বর্ণিত আছে যে, যাদুকর ছিলেন লাবীদ ইবনুল আ’সাম, যিনি বনু যুরায়কের এক ইহুদি ব্যক্তি ছিলেন। আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বিষয়টি অবহিত করেন। এরপর যাদুর বস্তু উদ্ধার করা হয় এবং তিনি সুস্থ হয়ে যান। এখানে লক্ষণীয় কয়েকটি বিষয়:
প্রথমত, হাদীসে কোথাও বলা হয়নি যে যাদুর কারণে কুরআনের কোনো আয়াত ভুল হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয়ত, কোথাও বলা হয়নি যে ওহী বিকৃত হয়েছিল। তৃতীয়ত, কোথাও বলা হয়নি যে শরীয়তের বিধান পরিবর্তিত হয়েছিল। বরং অধিকাংশ শারহকার (যেমন ইমাম নববী, ইবনু হাজার আল-আসকালানী, কাজী ইয়ায প্রমুখ) ব্যাখ্যা করেছেন যে, এ প্রভাবটি ছিল কিছু ব্যক্তিগত ও পার্থিব বিষয়ে সাময়িক অনুভূতিগত (Perceptual) প্রভাব, যা নবুওয়াত, ওহী বা শরীয়ত প্রচারের নির্ভরযোগ্যতাকে স্পর্শ করেনি। এ কারণেই শাস্ত্রীয় ইসলামী ঐতিহ্যে অধিকাংশ মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ এই হাদীস গ্রহণ করেছেন এবং একে কুরআনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে করেননি।
৪. আইনগত বিশ্লেষণ (Legal Analysis): ইসলামী আইনের (Islamic Law) একটি মৌলিক নীতি হলো, নবীগণ ওহী প্রাপ্তি, সংরক্ষণ এবং প্রচারের ক্ষেত্রে আল্লাহর বিশেষ হেফাজতে থাকেন। আল্লাহ বলেন: “আল্লাহ আপনাকে মানুষের (অনিষ্ট) থেকে রক্ষা করবেন।” (সূরা আল-মায়িদা, ৫:৬৭)। এ আয়াতের আলোকে অধিকাংশ মুফাসসির ব্যাখ্যা করেছেন যে, এই হেফাজত মূলত রিসালাত ও ওহী প্রচারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি, শক্তি বা শয়তান ওহীর সত্যতা বিকৃত করতে পারে না।
অন্যদিকে সহীহ বুখারীর আলোচ্য হাদীসে এমন কোনো বক্তব্য নেই যে, যাদুর কারণে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কুরআনের কোনো আয়াত ভুলভাবে প্রচার করেছিলেন, শরীয়তের কোনো বিধান পরিবর্তন করেছিলেন, অথবা ওহীর মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছিল। হাদীসে কেবল ব্যক্তিগত জীবনের কিছু পার্থিব বিষয়ে সাময়িক অনুভূতিগত প্রভাবের কথা এসেছে। অতএব আইনগতভাবে দুটি বিষয় পৃথক: (ক) ওহীর অখণ্ডতা (Integrity of Revelation), এটি কুরআনের নিশ্চিত ঘোষণা। (খ) একজন মানুষের পার্থিব জীবনে সাময়িক শারীরিক বা মানসিক প্রভাব, এটি মানবীয় বাস্তবতার অংশ হতে পারে। আইনের ভাষায় এ দুটি ভিন্ন বিষয় (Different Legal Subjects)। ফলে একটিকে অন্যটির সঙ্গে অভিন্ন ধরে নেওয়া পদ্ধতিগতভাবে সঠিক নয়।
৫. নীতি বিশ্লেষণ (Policy Analysis): কুরআনের নীতিগত উদ্দেশ্য (Policy Objective) ছিল মুশরিকদের একটি অপবাদ খণ্ডন করা। তাদের দাবি ছিল, (ক). মুহাম্মদ (ﷺ)-এর নবুওয়াত সত্য নয়। (খ). তিনি যাদুর প্রভাবে কথা বলেন। (গ). অতএব তাঁর অনুসরণ করা যাবে না। নেতৃত্ব দানকারী কাফির কুরাইশরা এই অপবাদ মক্কার সাধারণ মুশরিক এবং মক্কার বাইরে থেকে আগত আগন্তকদের মধ্যে এই অপবাদ ছড়িয়ে দিয়ে ইসলামী কার্যক্রমকে বাধাগস্ত করতে চেয়েছিল।
কুরআন এই যাদুগ্রস্ত হওয়ার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্যদিকে হাদীসের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি কোনো আকীদা প্রতিষ্ঠার জন্য নয়; বরং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবনের একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ। অতএব দুটি পাঠের নীতি উদ্দেশ্য (Policy Objective) এক নয়। একটি নবুওয়াত রক্ষা করছে। অন্যটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনা করছে।
৬. নৈতিক বিশ্লেষণ (Ethical Analysis): নৈতিক দর্শনের আলোকে বিষয়টি তিনটি মাত্রায় বিশ্লেষণ করা যায়:
(ক). কর্তব্যভিত্তিক নৈতিকতা (Deontological Ethics): ইসলামে সত্য বলা কর্তব্য। যদি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবনে কোনো কষ্টকর ঘটনা ঘটে থাকে, তবে তা গোপন না করে সংরক্ষণ করাও সত্যনিষ্ঠার অংশ। এ কারণেই সাহাবীগণ এমন ঘটনাও বর্ণনা করেছেন যা তাঁদের আবেগের পক্ষে সহজ ছিল না। এটি ইসলামী ঐতিহাসিক সততার (Historical Integrity) একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
(খ). ফলাফলভিত্তিক নৈতিকতা (Consequentialism): এই হাদীসের উদ্দেশ্য মানুষকে বোঝানো, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মানুষ ছিলেন। তিনি অসুস্থও হয়েছেন। তিনি আঘাতও পেয়েছেন। যাদুর আক্রমণের শিকারও হয়েছেন। কিন্তু আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে সংরক্ষণ করেন। এতে নবুওয়াতের বিশ্বাস দুর্বল নয়; বরং আরও বাস্তব ও মানবিক হয়ে ওঠে।
(গ) গুণনৈতিকতা (Virtue Ethics): এই ঘটনায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যে গুণাবলি প্রকাশ পায়, ধৈর্য (সবর), আল্লাহর উপর নির্ভরতা (তাওয়াক্কুল), দু’আ, আল্লাহর সাহায্যের অপেক্ষা, প্রতিশোধপরায়ণ না হওয়া। এসবই ইসলামী নৈতিকতার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
৭. তাফসীরভিত্তিক বিশ্লেষণ (Exegetical Analysis): তাফসীরশাস্ত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কুরআনের “মাসহূর” শব্দের অর্থ কী? ইমাম তাবারী, ইবন কাসীর, কুরতুবী, ফখরুদ্দীন রাযী, আবু হাইয়ানসহ অধিকাংশ মুফাসসির ব্যাখ্যা করেছেন, এখানে “মাসহূর” অর্থ এমন ব্যক্তি যার নবুওয়াত বাতিল; যার কথার উৎস ওহী নয়; বরং যাদু। অর্থাৎ এটি মানসিক বিভ্রমের চিকিৎসাগত বিবরণ নয়। এটি আকীদাগত অপবাদ। অন্যদিকে সহীহ হাদীস এমন কোনো দাবি করে না যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নবুওয়াত যাদুর ফল। ফলে উভয় পাঠের আলোচ্য বিষয় ভিন্ন।
৮. ফিকহী বিশ্লেষণ (Fiqh Analysis): ফিকহের আলোকে এখানে দুটি নীতি গুরুত্বপূর্ণ:
(ক). নবীগণ মানব: আল্লাহ বলেন, “বলুন, আমি তো তোমাদের মতোই একজন মানুষ; তবে আমার প্রতি ওহী নাযিল করা হয়।” (সূরা আল-কাহফ, ১৮:১১০)। এই আয়াত মানবীয় বৈশিষ্ট্য এবং ওহীপ্রাপ্তির বৈশিষ্ট্য, উভয়কে একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করেছে। অতএব ক্ষুধা, নিদ্রা, অসুস্থতা, আঘাত, রক্তপাত, ক্লান্তি, এসব নবীদের মানবীয় বৈশিষ্ট্য।
অতএব নবীগণ মানুষের মতোই: ক্ষুধার্ত হতেন (সূরা আল-ফুরকান, ২৫:২০); খাদ্য গ্রহণ করতেন (২৫:২০); বাজারে চলাফেরা করতেন (২৫:২০); নিদ্রা যেতেন; অসুস্থ হতেন; আঘাতপ্রাপ্ত হতেন; রক্তপাত হতো; ক্লান্ত হতেন; শারীরিক চিকিৎসা গ্রহণ করতেন। এসব মানবীয় বৈশিষ্ট্য তাঁদের নবুওয়াতকে ক্ষুণ্ন করে না।
(খ). ওহী সংরক্ষিত: নবীদের মানবীয় সীমাবদ্ধতা কখনোই ওহীর সত্যতা বা শরীয়তের নির্ভরযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না। আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ আপনাকে মানুষের (অনিষ্ট) থেকে রক্ষা করবেন।” (সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:৬৭)।
আবারো আল্লাহ বলেন: “তিনি নিজের প্রবৃত্তি থেকে কথা বলেন না; এটি তো কেবল ওহী।” (সূরা আন-নাজম, ৫৩:৩–৪)। ফিকহ ও আকীদার আলোকে এই নীতি ব্যাখ্যা করতে কয়েকটি ঐতিহাসিক উদাহরণ গুরুত্বপূর্ণ:
প্রথম উদাহরণ: উহুদের যুদ্ধে আহত হওয়া: উহুদের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দাঁত শহীদ হয়েছিল, মুখমণ্ডল রক্তাক্ত হয়েছিল এবং তাঁর মাথার লোহার হেলমেট ভেঙে গিয়েছিল (সহীহ বুখারী; সহীহ মুসলিম)। কিন্তু কোনো সাহাবী বলেননি, “যেহেতু তিনি আহত হয়েছেন, তাই ওহী আর নির্ভরযোগ্য নয়।” কারণ শারীরিক আঘাত এবং ওহী, দুটি ভিন্ন বিষয়।
দ্বিতীয় উদাহরণ: অসুস্থতা: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জীবনের শেষ দিকে কঠিন জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ইবন মাসউদ (রা.) বলেন, “আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে এমন কঠিন জ্বরে আক্রান্ত দেখেছি, যা অন্যদের থেকে দ্বিগুণ ছিল।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৬৪৮; সহীহ মুসলিম)। কিন্তু জ্বর তাঁর নবুওয়াতকে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি।
তৃতীয় উদাহরণ: চিকিৎসা গ্রহণ: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজে চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন এবং অন্যদেরও চিকিৎসা গ্রহণ করতে উৎসাহিত করেছেন। এতে বোঝা যায়, নবীগণ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন; তবে এটি তাঁদের রিসালাতকে প্রভাবিত করে না।
চতুর্থ উদাহরণ: ইফকের ঘটনা: ইফকের ঘটনায় (আয়িশা (রা.)-এর বিরুদ্ধে অপবাদ) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কয়েকদিন পর্যন্ত ওহীর অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি নিজের পক্ষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত দেননি। পরে সূরা আন-নূরের আয়াত নাযিল হয়। এটি প্রমাণ করে, তিনি ওহীর বাইরে নিজে শরীয়ত রচনা করতেন না।
পঞ্চম উদাহরণ: খেজুর গাছে পরাগায়নের ঘটনা: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একটি কৃষি-পরামর্শ দিয়েছিলেন। পরে খেজুরের ফলন কম হলে তিনি বলেন, “তোমরা তোমাদের পার্থিব বিষয়গুলো বেশি জানো।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৩৬৩)। এখানে তিনি নিজেই দুনিয়াবি বিষয়ে মানবীয় অভিজ্ঞতা এবং ওহীর বিষয়কে পৃথক করেছেন।
ষষ্ঠ উদাহরণ: বদরের যুদ্ধবন্দীদের বিষয়ে ইজতিহাদ: বদরের বন্দীদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও কয়েকজন সাহাবীর মতামত ছিল মুক্তিপণ গ্রহণ করা। পরবর্তীতে আল্লাহ সূরা আল-আনফাল (৮:৬৭–৬৮)-এ এ বিষয়ে ওহী নাযিল করেন। এটি দেখায়, নবীর ব্যক্তিগত ইজতিহাদ ও আল্লাহর চূড়ান্ত ওহী এক বিষয় নয়; বরং ওহীই শেষ সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে।
ফিকহী সিদ্ধান্ত: ফিকহ ও আকীদার আলোকে নবীদের মানবীয় বৈশিষ্ট্য এবং ওহীর সংরক্ষণ দুটি পৃথক নীতি। ক্ষুধা, নিদ্রা, অসুস্থতা, আঘাত, চিকিৎসা গ্রহণ কিংবা পার্থিব বিষয়ে সাময়িক মানবীয় অভিজ্ঞতা, এসবের কোনোটিই নবুওয়াত বা ওহীর নির্ভুলতাকে ক্ষুণ্ন করে না। সুতরাং, যদি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত যাদুর ঘটনাকে অধিকাংশ মুহাদ্দিস ও মুফাসসিরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী ব্যক্তিগত ও পার্থিব বিষয়ে সীমাবদ্ধ হিসেবে বোঝা হয়, তবে তা ওহীর অখণ্ডতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয় না। এই কারণেই শাস্ত্রীয় ইসলামী ঐতিহ্যে এ হাদীসকে ওহীর নিরাপত্তার পরিপন্থী হিসেবে গণ্য করে নি।
৯. শাস্ত্রীয় আলেমদের মতামত (Classical Scholarly Views): রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ওপর জাদুর প্রভাব সম্পর্কিত সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের হাদীস ইসলামী ঐতিহ্যে দীর্ঘকাল ধরে আলোচিত হয়েছে। অধিকাংশ মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ এই হাদীসকে সহীহ হিসেবে গ্রহণ করলেও এর পরিধি (Scope) অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নির্ধারণ করেছেন। তাঁদের বক্তব্যের সারাংশ নিম্নরূপ।
(ক). ইমাম আন-নববী (রাহি.): ইমাম নববী (রাহি.) তাঁর শরহ সহীহ মুসলিম-এ বলেন, এই জাদুর প্রভাব ছিল কেবল রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কিছু পার্থিব বিষয়ে। এটি কখনোই ওহী, শরীয়তের বিধান, নবুওয়াত বা দ্বীনের প্রচারে কোনো প্রভাব ফেলেনি। তিনি আরও বলেন, নবীগণ মানুষের মতো রোগে আক্রান্ত হতে পারেন, আহত হতে পারেন, কিন্তু আল্লাহ তাঁদেরকে ওহীর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সংরক্ষণ করেছেন।
(খ). ইবনু হাজার আল-আসকালানী (রাহি.): ইবনু হাজার (রাহি.) ফাতহুল বারী-তে লিখেছেন, হাদীসে বর্ণিত “يُخَيَّلُ إِلَيْهِ” (তাঁর কাছে এমন মনে হতো) কথাটি বাস্তবতার পরিবর্তন নয়; বরং সাময়িক অনুভূতির (Perception) বিষয়। তিনি ব্যাখ্যা করেন, এটি এমন ছিল যে, কোনো কাজ করেছেন বলে মনে হতো, অথচ বাস্তবে করেননি; কিন্তু এর সঙ্গে ওহী, শরীয়ত বা দ্বীনের কোনো সম্পর্ক ছিল না।
(গ). কাজী ইযায (রাহি.): প্রখ্যাত মালিকী আলেম কাজী ইযায (রাহি.) বলেন, মুসলিম উম্মাহর ইজমা (Consensus) হলো, নবীগণ ওহী পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে আল্লাহর বিশেষ হিফাজতে থাকেন। অতএব, এই হাদীসকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে না, যাতে নবুওয়াতের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
(ঘ). ইমাম আল-কুরতুবী (রাহি.): ইমাম কুরতুবী (রাহি রহ.) বলেন, কুরআনে মুশরিকদের অভিযোগ ছিল: “তোমরা তো এক জাদুগ্রস্ত ব্যক্তিরই অনুসরণ করছ।” এই অভিযোগের অর্থ ছিল যে, জাদুর প্রভাবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বুদ্ধি, বিচারশক্তি ও নবুওয়াত নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু সহীহ হাদীস এমন কিছুই বলে না। বরং হাদীসে বর্ণিত ঘটনা একটি সাময়িক শারীরিক বা ইন্দ্রিয়গত প্রভাবের কথা বলে; নবুওয়াতের সত্যতা অক্ষুণ্ণ ছিল। অতএব দুই বক্তব্যের বিষয়বস্তু এক নয়।
(ঙ). ইবনু তাইমিয়্যা (রাহি.): শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা (রহ.) বলেন, নবীগণ মানুষের মতো অসুস্থ হতে পারেন, আঘাতপ্রাপ্ত হতে পারেন কিংবা সাময়িক কষ্টে পড়তে পারেন; কিন্তু আল্লাহ তাঁদেরকে ওহী বিকৃত হওয়া বা দ্বীন প্রচারে ভুল করার হাত থেকে সংরক্ষণ করেন। এটাই নবীদের ওহী পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে নিষ্পাপতার অর্থ।
এই মতামতগুলোর তাৎপর্য: লক্ষণীয় যে, উপরোক্ত কোনো শাস্ত্রীয় আলেমই বলেননি যে জাদুর কারণে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ওপর অবতীর্ণ ওহী পরিবর্তিত হয়েছিল, অথবা তিনি শরীয়তের বিধান ভুলভাবে প্রচার করেছিলেন। বরং তাঁদের সর্বসম্মত অবস্থান হলো: (ক). জাদুর ঘটনাটি (যদি সহীহ হিসেবে গ্রহণ করা হয়) ছিল সাময়িক ও সীমিত। (খ). এটি ব্যক্তিগত ও পার্থিব বিষয়ে সীমাবদ্ধ ছিল। (গ). ওহী, আকীদাহ, শরীয়ত ও নবুওয়াতের দায়িত্ব এর দ্বারা প্রভাবিত হয়নি। (ঘ). আল্লাহর কুরআনিক প্রতিশ্রুতি, ওহীর সংরক্ষণ সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ ছিল।
গবেষণাগত মন্তব্য (Academic Observation): তবে এটিও উল্লেখযোগ্য যে, ইসলামী ঐতিহ্যের সব আলেম এই হাদীসের ব্যাখ্যায় একমত নন। বিশেষত কিছু মুফাসসির, কালামবিদ এবং আধুনিক গবেষক যুক্তি দিয়েছেন যে, কুরআনে মুশরিকদের “মাসহূর” (মন্ত্রবশ/জাদুগ্রস্ত) অভিযোগ যেভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, তার আলোকে এই হাদীসের ব্যাখ্যা আরও সতর্কতার সঙ্গে করা উচিত। ফলে এ বিষয়ে ইসলামী ঐতিহ্যের ভেতরেও ব্যাখ্যাগত (Interpretive) আলোচনা বিদ্যমান। কিন্তু সেই মতভেদ মূলত হাদীসের অর্থ ও প্রয়োগ নিয়ে; ওহীর কর্তৃত্ব বা কুরআনের সর্বোচ্চ অবস্থান নিয়ে নয়।
১০. উসূলুল ফিকহের আলোকে বিশ্লেষণ: এখানে কয়েকটি মৌলিক নীতি প্রযোজ্য:
প্রথম নীতি: দুই দলিলের (কুরআন ও হাদিস) মধ্যে যতদূর সম্ভব সমন্বয় করা, একটিকে অন্যটির ওপর প্রাধান্য দেওয়ার আগে অগ্রাধিকার পায়। এখানে কুরআন ও হাদীসকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর পরিবর্তে তাদের আলোচ্য বিষয় পৃথকভাবে বোঝা অধিকতর গ্রহণযোগ্য।
দ্বিতীয় নীতি: কোনো বক্তব্যের যথাযথ অর্থ নির্ধারণে তার প্রেক্ষাপট ও কারণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ; কেবল শব্দের সাধারণ অর্থের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। এখানে “মাসহূর” শব্দটি মুশরিকদের অপবাদের প্রসঙ্গে এসেছে। এটিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষা হিসেবে পড়া সঠিক নয়।
তৃতীয় নীতি: দুটি অকাট্য শরয়ী দলিলের মধ্যে প্রকৃত সাংঘর্ষিকতা হতে পারে না। যদি আপাত বিরোধ দেখা যায়, তবে ব্যাখ্যা পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
১১. মাকাসিদুশ শরীআহ (Objectives of Islamic Law): শরীয়তের মৌলিক উদ্দেশ্য পাঁচটি: দ্বীনের সংরক্ষণ; জীবনের সংরক্ষণ; বুদ্ধির সংরক্ষণ; বংশের সংরক্ষণ; এবং সম্পদের সংরক্ষণ। এ আলোচনায় বিশেষভাবে প্রথম দুটি উদ্দেশ্য গুরুত্বপূর্ণ। কুরআন নবুওয়াতের মর্যাদা সংরক্ষণ করেছে। হাদীস মানুষের বাস্তবতা তুলে ধরেছে। দুটি উদ্দেশ্য পরস্পরবিরোধী নয়। বরং পরিপূরক।
১২. ইসলামী জ্ঞানতত্ত্ব ও বক্তব্যের মূল্যায়ন: কিছু দ্বীনি ভাই দাবি করেন, “যদি কুরআন বলে জালিমরাই রাসূলকে যাদুগ্রস্ত বলে, তাহলে এই হাদীসের রাবী এবং হাদীস গ্রহণকারীরাও জালিম।” এই যুক্তির সমালোচনামূলক মূল্যায়নে কয়েকটি বিষয় বিবেচ্য। প্রথমত, কুরআনের আলোচ্য অভিযোগ ছিল, রাসূলের নবুওয়াতই যাদুর ফল। দ্বিতীয়ত, হাদীস এমন কোনো দাবি করে না। তৃতীয়ত, হাদীসের রাবী আয়িশা (রা.) কখনো বলেননি, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ওহী যাদুর প্রভাবে ছিল। অতএব কুরআনের প্রত্যাখ্যাত দাবিকে হাদীসের বক্তব্যের সঙ্গে অভিন্ন ধরে নেওয়া একটি বিষয়গত বিভ্রান্তি (Category Error)।
অবশ্যই এটিও সত্য যে ইসলামী ঐতিহ্যে কিছু প্রাচীন ও পরবর্তী আলেম, যেমন কাজী আবু বকর আল-বাকিল্লানী, আবু মুসলিম আল-ইসফাহানী প্রমুখ, এই হাদীসের ব্যাখ্যা বা গ্রহণযোগ্যতার কিছু দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আবার ইমাম নববী, ইবনু হাজার, কাজী ইয়াযসহ অধিকাংশ মুহাদ্দিস ও মুফাসসির এ হাদীসকে গ্রহণ করেছেন এবং কুরআনের সঙ্গে এর সমন্বয় ব্যাখ্যা করেছেন। অতএব এটি এমন একটি বিষয়, যেখানে ইসলামী ঐতিহ্যের ভেতরেও আলোচনা হয়েছে। তবে সমালোচনার ক্ষেত্রেও পূর্ণ দলিল, ভাষা, প্রেক্ষাপট এবং উসূলুল ফিকহের নীতিমালা অনুসরণ করা একাডেমিকভাবে অধিকতর গ্রহণযোগ্য।
১৩. উপসংহার: আইন, তাফসীর, উসূলুল ফিকহ, নৈতিকতা, দর্শন, মাকাসিদুশ শরীআহ এবং ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বের আলোকে আলোচ্য দলিলসমূহ বিশ্লেষণ করলে প্রতীয়মান হয় যে কুরআন ও সহীহ বুখারীর আলোচ্য বর্ণনা ভিন্ন বিষয় ও ভিন্ন প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করছে।
কুরআন প্রত্যাখ্যান করেছে মুশরিকদের সেই আকীদাগত অপবাদ, যার মাধ্যমে তারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নবুওয়াত ও ওহীর সত্যতাকে অস্বীকার করেছিল। অন্যদিকে সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে তাঁর জীবনের একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনা, যেখানে কোনোভাবেই ওহীর সংরক্ষণ, শরীয়তের বিধান বা নবুওয়াতের নির্ভরযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়নি।
অতএব আলোচ্য উদাহরণে কুরআন ও সহীহ হাদীসকে সরাসরি পরস্পরবিরোধী ঘোষণা করার আগে তাদের ভাষাগত ব্যবহার, নাযিল হওয়ার প্রেক্ষাপট (আসবাবুন নুযুল), আলোচ্য বিষয়, উদ্দেশ্য এবং দলিলসমূহের সমন্বয়-এর উসূলগত নীতি বিবেচনা করা অধিকতর পদ্ধতিগত ও গবেষণাসম্মত। এই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করলে আপাত সাংঘর্ষিকতার পরিবর্তে উভয় পাঠের নিজ নিজ উদ্দেশ্য ও পরিসর অধিক স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয় এবং ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বের অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্যও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আল্লাহুম্মা সাল্লি, ওয়া সাল্লিম, ওয়া বারিক ‘আলা সাইয়্যিদিনা মুহাম্মাদ, ওয়া আলা আলিহি ওয়া সাহবিহি আজমাঈন। ওয়ালহামদু লিল্লাহি রব্বিল ‘আলামীন। (মূসা: ১৫-০৭-২৬)




















