ঢাকা ০৫:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতকে পোশাক শিল্পের মতো সুবিধা দেওয়া হবে: অর্থমন্ত্রী কয়লা খনি দুর্নীতি মামলা থেকে অব্যাহতি পেলেন হোসাফের মোয়াজ্জেম সংস্কার বাস্তবায়নে বিএনপির টালবাহানার কথা ইইউকে জানালেন বিরোধীদলীয় নেতা অধিবেশন চলাকালে অসুস্থ জামায়াত এমপির খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর কাছে চাঁদাবাজ ও দূর্নীতিবিরোধী কার্ড চান আসিফ মাহমুদ সংকট সমাধানে প্রয়োজন কার্যকরী পদক্ষেপ: ড. মাসুদ তারেক রহমানের সফল নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান সম্পন্ন হয়েছে : সেতুমন্ত্রী পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের আরো কাছে বাংলাদেশ জলাবদ্ধতায় চট্টগ্রামবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ প্রধানমন্ত্রীর বজ্রপাতে বাবার মৃত্যু, কোল থেকে ছিটকে বাঁচল মেয়ে

পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের আরো কাছে বাংলাদেশ

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৫৯:২২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে

প্রসঙ্গ অনলাইন: দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের অভিজাত ক্লাবে নাম লেখাল বাংলাদেশ। এক দশকের নিরবচ্ছিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ এবং জটিল সব কারিগরি ধাপ পেরিয়ে অবশেষে মিলেছে কাঙ্ক্ষিত ‘কমিশনিং লাইসেন্স’। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে গতকাল মঙ্গলবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) লোডিং কার্যক্রম শুরু হয়। এর মাধ্যমেই শুরু হলো দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরীক্ষামূলক উৎপাদন প্রক্রিয়া। এটি দেশের কার্বনমুক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

গতকাল দুপুরে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরে আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এ কার্যক্রম শুরু হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, সচিব আনোয়ার হোসেন, রাশিয়ান সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালক এলেক্সি লিখাআভ বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে ভিডিও বার্তায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি বাংলাদেশকে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জন্য আজকের দিনটি ঐতিহাসিক।বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে এ বিদ্যুৎকেন্দ্র বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বড় ভূমিকা রাখবে।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এ কেন্দ্রের জ্বালানি ‘ইউরেনিয়াম’ আসে। এতদিন সর্বোচ্চ সতর্কতায় প্রকল্প এলাকায় সংরক্ষিত ছিল জ্বালানি, গতকাল যা রিয়েক্টর প্রেশার ভেসেল বা চুল্লিপাত্রে বসানো হয়। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এই ইউরেনিয়াম-২৩৫-এর সমৃদ্ধ ধাতব পদার্থটি। খনির আকরিক থেকে নানা প্রক্রিয়া করে তৈরি করা এই ইউরেনিয়ামের জ্বালানি যেন দেশ এবং পরিবেশের জন্য কোনো হুমকির কারণ না হয়ে দাঁড়ায়, এর জন্য নিশ্চিত করা হয়েছে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা। এজন্য ইতোমধ্যে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ভিভিইআর-১২০০ শ্রেণির জেনারেশন থ্রি প্লাস রিঅ্যাক্টর স্থাপন করা হয়েছে। অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের চেয়ে তিন-চারগুণ বেশি সার্ভিস লাইফের এ কেন্দ্রে মাত্র এক গ্রাম ইউরেনিয়াম দিয়ে ২৪ হাজার ইউনিট (কিলোওয়াট আওয়ার) বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। ফুয়েল লোডিং কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং রাশিয়ার নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান রোসাটম একযোগে কাজ করছে।

করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতায় কাজ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হলেও সরকারের দৃঢ়তায় এ মাইলফলক স্পর্শ করা সম্ভব হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কঠোর নজরদারি এবং নিরাপত্তার সব শর্ত পূরণ করায় গত ১৬ এপ্রিল রূপপুর কর্তৃপক্ষকে পরমাণু চুল্লিতে জ্বালানি প্রবেশের লাইসেন্স প্রদান করা হয়।

ইউরেনিয়াম লোডিংয়ের মাধ্যমে দেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল পর্যায়ে প্রবেশ করছে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ বা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভৌত যাত্রা; যেখানে চেইন রিঅ্যাকশনের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শক্তি উৎপাদন শুরু হয়।

ফুয়েল লোডিং এবং আনুষঙ্গিক পরীক্ষা শেষে সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের জুলাইয়ের শেষ বা আগস্ট মাসের দিকে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে এ কেন্দ্র থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে।

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার পদ্মার তীরে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এ প্রকল্পের দুটি ইউনিট থেকে মোট দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংস্থা রোসাটমের প্রকৌশল বিভাগ জেনারেল কন্ট্রাকটর হিসেবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।

রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ সঞ্চালনে প্রয়োজনীয় গ্রিডলাইনও প্রস্তুত হয়েছে বলে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) জানিয়েছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ধারণাটি ১৯৬৮ সালের। কিন্তু সে সময় হয়নি। স্বাধীনতাপূর্ব ও পরবর্তী বিভিন্ন পর্যায়ে প্রথমত যাচাইয়ের জন্য একাধিক সমীক্ষা চালানো হয়। প্রতিটি সমীক্ষায় প্রতিটি কারিগরি অর্থনীতি এবং আর্থিক যৌক্তিকতা প্রতীয়মান হয়। তবে সে সময়ের আর্থিক প্রযুক্তিগত কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতার পর ১৯৭৮ সালে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমীক্ষা পরিচালিত হয়, যা ভবিষ্যৎ বাস্তবায়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি স্থাপন করে। পরে ১৯৯৫ সালের ৭ মে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পদ্ধতি বাস্তবায়ন কমিটি এ সভায় নীতিগত সিদ্ধান্ত দেয়, যা বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচিতে নতুন গতিপথ প্রদান করে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও অর্থনীতির যে দর্শন সামনে এনেছিলেন, তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল এই পারমাণবিক প্রযুক্তির বিকাশ। আর তারই নেতৃত্বে বাংলাদেশে পারমাণবিক গবেষণার ভিত্তি সূচিত হয় এবং গবেষণার রিঅ্যাক্টর স্থাপনের মাধ্যমে আমাদের পারমাণবিক যাত্রার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত তৈরি হয়।

তিনি বলেন, আজ এই রূপপুর সেই স্বপ্নের মহিমান্বিত বাস্তব রূপ। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নির্বাচনি ইশতেহারেও বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আধুনিক রাষ্ট্র নির্মাণের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত হয়েছে। এটি তারই একটি শক্তিশালী প্রতিফলন। একটি আত্মনির্ভরশীল প্রযুক্তিনির্ভর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের যে স্বপ্ন জিয়াউর রহমান দেখিয়ে গেছেন, আজ আমরা সে পথেই এগিয়ে চলেছি।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আমাদের জাতীয় সক্ষমতার একটি প্রতীক। এ প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে প্রবেশ করলাম।

তিনি আরো বলেন, এ প্রকল্প বাস্তবায়নে রাশিয়ান ফেডারেশনের সহযোগিতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, আর্থিক সহায়তা এবং উপযুক্ত জ্ঞান, তথ্য-উপাত্ত বিনিময়ের মাধ্যমে এ প্রকল্প শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে। এ প্রকল্পে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কারিগরি সহায়তার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মান অনুসরণে সহযোগিতা আমাদের যাত্রাকে আরো নিরাপদ করছে।

ফুয়েল লোডিং প্রক্রিয়া

ইউরেনিয়াম ফুয়েল লোডিং হলো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লি বা রিঅ্যাক্টর কোরে পারমাণবিক জ্বালানি প্রবেশ করানোর অত্যন্ত সংবেদনশীল ও চূড়ান্ত কারিগরি প্রক্রিয়া। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা, গ্যাস বা তেলের বদলে জ্বালানি হিসেবে ইউরেনিয়ামের ছোট ছোট পেলেট ব্যবহার করা হয়, যার প্রতিটি সাড়ে চার থেকে পাঁচ গ্রাম ওজনের হয়ে থাকে।

এই পেলেটগুলোকে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ থেকে সুরক্ষিত রাখতে জিরকোনিয়াম অ্যালয় দিয়ে তৈরি টিউবের ভেতর সাজিয়ে ‘ফুয়েল অ্যাসেম্বলি’ তৈরি করা হয়।

এই অ্যাসেম্বলিগুলোকে রিঅ্যাক্টরের ভেতর স্থাপন করার প্রক্রিয়াই হলো ফুয়েল লোডিং। এটি সম্পন্ন হওয়ার পরই বিদ্যুৎকেন্দ্রে পরীক্ষামূলকভাবে ফিশন বা চেইন রিঅ্যাকশন (চুল্লিতে তাপ উৎপাদন) শুরু করা সম্ভব হয়। ফুয়েল লোডিং একটি অত্যাধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া। একটি বিশেষ ‘ফুয়েল লোডিং মেশিন’ বা রিফুয়েলিং মেশিনের সাহায্যে এই কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে এ প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন হবে। অনুমোদিত নিরাপত্তা কার্যপ্রণালি মেনে, রাশিয়ান ফেডারেশনের (রোসাটম) বিশেষজ্ঞদের সরাসরি সহায়তায় রূপপুর প্রকল্পের জন্য প্রশিক্ষিত ও যোগ্য বাংলাদেশি অপারেটর এবং ফুয়েল হ্যান্ডলাররা এই লোডিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছেন।

আসল ইউরেনিয়াম জ্বালানি ভরার আগে রিঅ্যাক্টরের সব সিস্টেম, পরিবহন সরঞ্জাম এবং লোডিং যন্ত্রপাতি ঠিকমতো কাজ করছে কি না, তা যাচাই করতে ‘ডামি ফুয়েল’ (আসল জ্বালানিহীন ডামি অ্যাসেম্বলি) দিয়ে সফলভাবে পরীক্ষা ও মহড়া চালানো হয় ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে। তার আগের বছর নভেম্বরে প্রথম ইউনিটের জন্য ইউরেনিয়ামের চালান বাংলাদেশে এসে পৌঁছায়।

ফুয়েল লোডিংয়ের সময় রিঅ্যাক্টরের ভেতরের অংশ বা রিঅ্যাক্টর ভ্যাসেল পানিতে পূর্ণ রাখা হয়, কারণ পানি বিকিরণ প্রতিরোধে সহায়তা করে। রিফুয়েলিং মেশিনের সাহায্যে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মোট ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি একে একে রিঅ্যাক্টর কোরের ভেতর নির্ধারিত স্থানে বসানো হবে।

প্রতিটি অ্যাসেম্বলি কোথায় বসবে, তা আগেই নির্ধারিত থাকে। এই বিন্যাস বা কোর কনফিগারেশন খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি রিঅ্যাক্টরের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নির্ধারণ করে। ফুয়েল বসানোর পর কন্ট্রোল রড (যা ফিশন রিয়েকশন নিয়ন্ত্রণ করে) সঠিকভাবে কাজ করছে কি না তা পরীক্ষা করা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে প্রায় ৪৫ দিন সময় লাগতে পারে।

১৬৩টি অ্যাসেম্বলি রিঅ্যাক্টর কোরে সফলভাবে লোড করার পর কেন্দ্রটিকে ‘মিনিমাম নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতায়’ আনা হবে। এই পর্যায়টিকে ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি বলা হয়, যেখান থেকে চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হবে।

প্রকল্পের প্রযুক্তিগত দিক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. শৌকত আকবর বলেন, প্রতিটি অ্যাসেম্বলি চার দশমিক ছয় মিটার বা ১৫ ফুট দীর্ঘ, ওজন প্রায় ৭৫০ কেজি। প্রতিটি অ্যাসেম্বলিতে প্রায় ৫৩৪ কেজি ফুয়েল ব্যবহার করা হয়। রিঅ্যাক্টরে ব্যবহৃত প্রতিটি ইউরেনিয়াম পেলেটের ওজন মাত্র সাড়ে চার থেকে পাঁচ গ্রাম হলেও এর শক্তি উৎপাদন ক্ষমতা অবিশ্বাস্য। একটি মাত্র পেলেট থেকে প্রায় এক টন কয়লার সমপরিমাণ শক্তি পাওয়া যাবে।

তিনি আরো বলেন, এই পেলেটগুলো কোনো বিষাক্ত ধোঁয়া বা কার্বন নিঃসরণ ছাড়াই একটি সাধারণ পরিবারের কয়েক মাসের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে সক্ষম।

জ্বালানি লোডিংয়ের পুরো প্রক্রিয়াটিতে অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণ করা হচ্ছে। বিশেষায়িত ফুয়েল লোডিং মেশিন ব্যবহার করে একে একে ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি কোরে বসানো হবে বলে জানান তিনি।

এই সময় পুরো সিস্টেমটি ‘সাব-ক্রিটিক্যাল’ অবস্থায় থাকবে এবং সার্বক্ষণিক নিউট্রন মনিটরিং সিস্টেম চালু থাকবে যাতে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের আরো কাছে বাংলাদেশ

আপডেট সময় : ০৯:৫৯:২২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬

প্রসঙ্গ অনলাইন: দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের অভিজাত ক্লাবে নাম লেখাল বাংলাদেশ। এক দশকের নিরবচ্ছিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ এবং জটিল সব কারিগরি ধাপ পেরিয়ে অবশেষে মিলেছে কাঙ্ক্ষিত ‘কমিশনিং লাইসেন্স’। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে গতকাল মঙ্গলবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) লোডিং কার্যক্রম শুরু হয়। এর মাধ্যমেই শুরু হলো দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরীক্ষামূলক উৎপাদন প্রক্রিয়া। এটি দেশের কার্বনমুক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

গতকাল দুপুরে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরে আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এ কার্যক্রম শুরু হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, সচিব আনোয়ার হোসেন, রাশিয়ান সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালক এলেক্সি লিখাআভ বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে ভিডিও বার্তায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি বাংলাদেশকে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জন্য আজকের দিনটি ঐতিহাসিক।বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে এ বিদ্যুৎকেন্দ্র বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বড় ভূমিকা রাখবে।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এ কেন্দ্রের জ্বালানি ‘ইউরেনিয়াম’ আসে। এতদিন সর্বোচ্চ সতর্কতায় প্রকল্প এলাকায় সংরক্ষিত ছিল জ্বালানি, গতকাল যা রিয়েক্টর প্রেশার ভেসেল বা চুল্লিপাত্রে বসানো হয়। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এই ইউরেনিয়াম-২৩৫-এর সমৃদ্ধ ধাতব পদার্থটি। খনির আকরিক থেকে নানা প্রক্রিয়া করে তৈরি করা এই ইউরেনিয়ামের জ্বালানি যেন দেশ এবং পরিবেশের জন্য কোনো হুমকির কারণ না হয়ে দাঁড়ায়, এর জন্য নিশ্চিত করা হয়েছে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা। এজন্য ইতোমধ্যে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ভিভিইআর-১২০০ শ্রেণির জেনারেশন থ্রি প্লাস রিঅ্যাক্টর স্থাপন করা হয়েছে। অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের চেয়ে তিন-চারগুণ বেশি সার্ভিস লাইফের এ কেন্দ্রে মাত্র এক গ্রাম ইউরেনিয়াম দিয়ে ২৪ হাজার ইউনিট (কিলোওয়াট আওয়ার) বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। ফুয়েল লোডিং কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং রাশিয়ার নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান রোসাটম একযোগে কাজ করছে।

করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতায় কাজ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হলেও সরকারের দৃঢ়তায় এ মাইলফলক স্পর্শ করা সম্ভব হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কঠোর নজরদারি এবং নিরাপত্তার সব শর্ত পূরণ করায় গত ১৬ এপ্রিল রূপপুর কর্তৃপক্ষকে পরমাণু চুল্লিতে জ্বালানি প্রবেশের লাইসেন্স প্রদান করা হয়।

ইউরেনিয়াম লোডিংয়ের মাধ্যমে দেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল পর্যায়ে প্রবেশ করছে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ বা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভৌত যাত্রা; যেখানে চেইন রিঅ্যাকশনের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শক্তি উৎপাদন শুরু হয়।

ফুয়েল লোডিং এবং আনুষঙ্গিক পরীক্ষা শেষে সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের জুলাইয়ের শেষ বা আগস্ট মাসের দিকে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে এ কেন্দ্র থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে।

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার পদ্মার তীরে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এ প্রকল্পের দুটি ইউনিট থেকে মোট দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংস্থা রোসাটমের প্রকৌশল বিভাগ জেনারেল কন্ট্রাকটর হিসেবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।

রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ সঞ্চালনে প্রয়োজনীয় গ্রিডলাইনও প্রস্তুত হয়েছে বলে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) জানিয়েছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ধারণাটি ১৯৬৮ সালের। কিন্তু সে সময় হয়নি। স্বাধীনতাপূর্ব ও পরবর্তী বিভিন্ন পর্যায়ে প্রথমত যাচাইয়ের জন্য একাধিক সমীক্ষা চালানো হয়। প্রতিটি সমীক্ষায় প্রতিটি কারিগরি অর্থনীতি এবং আর্থিক যৌক্তিকতা প্রতীয়মান হয়। তবে সে সময়ের আর্থিক প্রযুক্তিগত কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতার পর ১৯৭৮ সালে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমীক্ষা পরিচালিত হয়, যা ভবিষ্যৎ বাস্তবায়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি স্থাপন করে। পরে ১৯৯৫ সালের ৭ মে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পদ্ধতি বাস্তবায়ন কমিটি এ সভায় নীতিগত সিদ্ধান্ত দেয়, যা বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচিতে নতুন গতিপথ প্রদান করে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও অর্থনীতির যে দর্শন সামনে এনেছিলেন, তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল এই পারমাণবিক প্রযুক্তির বিকাশ। আর তারই নেতৃত্বে বাংলাদেশে পারমাণবিক গবেষণার ভিত্তি সূচিত হয় এবং গবেষণার রিঅ্যাক্টর স্থাপনের মাধ্যমে আমাদের পারমাণবিক যাত্রার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত তৈরি হয়।

তিনি বলেন, আজ এই রূপপুর সেই স্বপ্নের মহিমান্বিত বাস্তব রূপ। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নির্বাচনি ইশতেহারেও বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আধুনিক রাষ্ট্র নির্মাণের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত হয়েছে। এটি তারই একটি শক্তিশালী প্রতিফলন। একটি আত্মনির্ভরশীল প্রযুক্তিনির্ভর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের যে স্বপ্ন জিয়াউর রহমান দেখিয়ে গেছেন, আজ আমরা সে পথেই এগিয়ে চলেছি।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আমাদের জাতীয় সক্ষমতার একটি প্রতীক। এ প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে প্রবেশ করলাম।

তিনি আরো বলেন, এ প্রকল্প বাস্তবায়নে রাশিয়ান ফেডারেশনের সহযোগিতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, আর্থিক সহায়তা এবং উপযুক্ত জ্ঞান, তথ্য-উপাত্ত বিনিময়ের মাধ্যমে এ প্রকল্প শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে। এ প্রকল্পে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কারিগরি সহায়তার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মান অনুসরণে সহযোগিতা আমাদের যাত্রাকে আরো নিরাপদ করছে।

ফুয়েল লোডিং প্রক্রিয়া

ইউরেনিয়াম ফুয়েল লোডিং হলো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লি বা রিঅ্যাক্টর কোরে পারমাণবিক জ্বালানি প্রবেশ করানোর অত্যন্ত সংবেদনশীল ও চূড়ান্ত কারিগরি প্রক্রিয়া। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা, গ্যাস বা তেলের বদলে জ্বালানি হিসেবে ইউরেনিয়ামের ছোট ছোট পেলেট ব্যবহার করা হয়, যার প্রতিটি সাড়ে চার থেকে পাঁচ গ্রাম ওজনের হয়ে থাকে।

এই পেলেটগুলোকে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ থেকে সুরক্ষিত রাখতে জিরকোনিয়াম অ্যালয় দিয়ে তৈরি টিউবের ভেতর সাজিয়ে ‘ফুয়েল অ্যাসেম্বলি’ তৈরি করা হয়।

এই অ্যাসেম্বলিগুলোকে রিঅ্যাক্টরের ভেতর স্থাপন করার প্রক্রিয়াই হলো ফুয়েল লোডিং। এটি সম্পন্ন হওয়ার পরই বিদ্যুৎকেন্দ্রে পরীক্ষামূলকভাবে ফিশন বা চেইন রিঅ্যাকশন (চুল্লিতে তাপ উৎপাদন) শুরু করা সম্ভব হয়। ফুয়েল লোডিং একটি অত্যাধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া। একটি বিশেষ ‘ফুয়েল লোডিং মেশিন’ বা রিফুয়েলিং মেশিনের সাহায্যে এই কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে এ প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন হবে। অনুমোদিত নিরাপত্তা কার্যপ্রণালি মেনে, রাশিয়ান ফেডারেশনের (রোসাটম) বিশেষজ্ঞদের সরাসরি সহায়তায় রূপপুর প্রকল্পের জন্য প্রশিক্ষিত ও যোগ্য বাংলাদেশি অপারেটর এবং ফুয়েল হ্যান্ডলাররা এই লোডিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছেন।

আসল ইউরেনিয়াম জ্বালানি ভরার আগে রিঅ্যাক্টরের সব সিস্টেম, পরিবহন সরঞ্জাম এবং লোডিং যন্ত্রপাতি ঠিকমতো কাজ করছে কি না, তা যাচাই করতে ‘ডামি ফুয়েল’ (আসল জ্বালানিহীন ডামি অ্যাসেম্বলি) দিয়ে সফলভাবে পরীক্ষা ও মহড়া চালানো হয় ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে। তার আগের বছর নভেম্বরে প্রথম ইউনিটের জন্য ইউরেনিয়ামের চালান বাংলাদেশে এসে পৌঁছায়।

ফুয়েল লোডিংয়ের সময় রিঅ্যাক্টরের ভেতরের অংশ বা রিঅ্যাক্টর ভ্যাসেল পানিতে পূর্ণ রাখা হয়, কারণ পানি বিকিরণ প্রতিরোধে সহায়তা করে। রিফুয়েলিং মেশিনের সাহায্যে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মোট ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি একে একে রিঅ্যাক্টর কোরের ভেতর নির্ধারিত স্থানে বসানো হবে।

প্রতিটি অ্যাসেম্বলি কোথায় বসবে, তা আগেই নির্ধারিত থাকে। এই বিন্যাস বা কোর কনফিগারেশন খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি রিঅ্যাক্টরের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নির্ধারণ করে। ফুয়েল বসানোর পর কন্ট্রোল রড (যা ফিশন রিয়েকশন নিয়ন্ত্রণ করে) সঠিকভাবে কাজ করছে কি না তা পরীক্ষা করা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে প্রায় ৪৫ দিন সময় লাগতে পারে।

১৬৩টি অ্যাসেম্বলি রিঅ্যাক্টর কোরে সফলভাবে লোড করার পর কেন্দ্রটিকে ‘মিনিমাম নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতায়’ আনা হবে। এই পর্যায়টিকে ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি বলা হয়, যেখান থেকে চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হবে।

প্রকল্পের প্রযুক্তিগত দিক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. শৌকত আকবর বলেন, প্রতিটি অ্যাসেম্বলি চার দশমিক ছয় মিটার বা ১৫ ফুট দীর্ঘ, ওজন প্রায় ৭৫০ কেজি। প্রতিটি অ্যাসেম্বলিতে প্রায় ৫৩৪ কেজি ফুয়েল ব্যবহার করা হয়। রিঅ্যাক্টরে ব্যবহৃত প্রতিটি ইউরেনিয়াম পেলেটের ওজন মাত্র সাড়ে চার থেকে পাঁচ গ্রাম হলেও এর শক্তি উৎপাদন ক্ষমতা অবিশ্বাস্য। একটি মাত্র পেলেট থেকে প্রায় এক টন কয়লার সমপরিমাণ শক্তি পাওয়া যাবে।

তিনি আরো বলেন, এই পেলেটগুলো কোনো বিষাক্ত ধোঁয়া বা কার্বন নিঃসরণ ছাড়াই একটি সাধারণ পরিবারের কয়েক মাসের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে সক্ষম।

জ্বালানি লোডিংয়ের পুরো প্রক্রিয়াটিতে অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণ করা হচ্ছে। বিশেষায়িত ফুয়েল লোডিং মেশিন ব্যবহার করে একে একে ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি কোরে বসানো হবে বলে জানান তিনি।

এই সময় পুরো সিস্টেমটি ‘সাব-ক্রিটিক্যাল’ অবস্থায় থাকবে এবং সার্বক্ষণিক নিউট্রন মনিটরিং সিস্টেম চালু থাকবে যাতে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে।