ঢাকা ০২:৫০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিএনপি নেতার পাম্পে পুলিশ সদস্যকে পিটুনি আইভীকে গ্রেপ্তার দেখানো নিয়ে হাইকোর্টের রুল বিএনপির মাধবী মার্মার প্রার্থিতা বাতিল চান ছাত্রদল নেত্রী জাতীয় কাউন্সিলের আগেই ঢাকা মহানগর কমিটি পুনর্গঠন হচ্ছে জামায়াত নির্মূল করতে গিয়ে অনেকেই নির্মূল হয়ে গেছে: গোলাম পরওয়ার খাল কেটে কুমির আনবেন না: বিরোধী দলকে তথ্য প্রতিমন্ত্রী যুদ্ধ বন্ধে ইরানের নতুন প্রস্তাব—হরমুজ খোলা, পরমাণু আলোচনা পরের ধাপে খুলনা প্রেসক্লাবে দুর্বৃত্তদের হানা, হুমকির প্রতিবাদে সাংবাদিকদের বিক্ষোভ, অবরোধ শিক্ষার্থী-সাংবাদিকদের ওপর হামলায় জড়িতদের গ্রেপ্তার দাবি ‘জুলাই ঐক্যের’ খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার আসামি ছাত্রলীগ নেতার জামিন

আরো দুই সমন্বয়ককে তুলে নেয় ডিবি, সরকারের নির্মম দমন-পীড়ন

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০১:৩৬:৪৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৭ জুলাই ২০২৫ ৩৮ বার পড়া হয়েছে
জাতীয় ডেস্ক: সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সরকারি বাহিনীর নৃশংসতার মাঝেই ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই আরো দুই শীর্ষ সমন্বয়ক সারজিস আলম এবং হাসনাত আবদুল্লাহকে তুলে নেয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এর আগে গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শীর্ষ সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং আবু বাকের মজুমদারকে তুলে নিয়েছিল ডিবি।

ডিবির তৎকালীন অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. জুনায়েদ আলম সরকার তখন বলেছিলেন, ‘গত কয়েক দিনে ঘটে যাওয়া সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও সহিংসতার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার স্বার্থে এই পাঁচজনকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।’

শীর্ষ সমন্বয়কদের তুলে নেওয়ার মাঝেই সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার করে আদালতের রায়ের পর সরকারের জারি করা প্রজ্ঞাপন প্রত্যাখ্যান করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে সমন্বয়করা সরকারকে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটামও দেন। তাদের নতুন তিন দাবি ছিলÑনাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদসহ আটক সব শিক্ষার্থীর মুক্তি, আন্দোলনের নামে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহার এবং শিক্ষার্থী গণহত্যার সঙ্গে জড়িত মন্ত্রী থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত দায়ী সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ।

আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক মাহিন সরকার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘সরকার দাবি করছে আন্দোলনের মূল দাবি মানা হয়েছে। কিন্তু আমরা দাবি করেছিলাম একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করে সমস্যার সমাধান করতে হবে। সেটি হয়নি। তাই প্রজ্ঞাপন প্রত্যাখ্যান করছি।’

অন্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেছিলেন, ‘এখন পর্যন্ত তিন হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দাবি মানা না হলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।’

সারা দেশে দেয়াল লিখন ও প্রচার কর্মসূচি

অন্তর্বর্তী কর্মসূচি হিসেবে ২৮ জুলাই থেকে সারা দেশে অনলাইন ও অফলাইন মাধ্যমে প্রচার, দেয়াল লিখন ও গ্রাফিতি কর্মসূচি শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন দূতাবাসে দলিল পেশের উদ্যোগ নেওয়া হয়। অপরদিকে আহত ও নিহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি এবং তাদের পরিবারকে আর্থিক ও মানসিক সহায়তার জন্য ‘হেলথ ফোর্স’ ও ‘লিগ্যাল ফোর্স’ গঠন করার কথাও বলা হয়।

শিক্ষক ও মানবাধিকার সংগঠনের উদ্বেগ

ডিবি হেফাজতে নেওয়া পাঁচ সমন্বয়কের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষার্থী থাকায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ২৭ জুলাই বিকালে ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক’-এর ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ডিবি কার্যালয়ে যায় তাদের খোঁজ নিতে। দীর্ঘ অপেক্ষার পরও তারা ডিবিপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেননি।

শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে শিক্ষকরা কঠোর অবস্থান নেন। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ (এইচআরএফবি) উদ্বেগ প্রকাশ করে শিক্ষার্থীদের প্রতি হয়রানি ও নির্যাতন বন্ধে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানায়।

সরকার ও বিরোধীদের বিবৃতি

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাসপাতালে গিয়ে আহতদের চিকিৎসার খোঁজখবর নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতি বিষোদ্গার করে বলেন, ‘দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করার উদ্দেশ্যেই এ সহিংসতা চালানো হয়েছে।’

অপরদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রের দমননীতির নিন্দা করে সরকারের পদত্যাগ দাবি করেন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশ জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারকে চিঠি লিখে বাংলাদেশে চলমান সহিংসতা ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি এবং শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতে দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান জানান।

শেখ হাসিনার সরকারের দমন-পীড়ন সত্ত্বেও ছাত্র সংগঠনগুলো দেশব্যাপী প্রতিবাদ আন্দোলন অব্যাহত রাখে। জুলাইয়ের শেষভাগে কোটা সংস্কার আন্দোলনের বিরুদ্ধে সরকারের দমন-পীড়ন ও সহিংসতা তীব্র হয়ে ওঠে। ১১ দিনে ৯ হাজার ১২১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদের মধ্যে দুই হাজার ৫৩৬ জনকে ঢাকায় এবং ৩৯৬ জনকে গাজীপুরে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারদের মধ্যে অনেকেই নিরীহ ব্যক্তি, যাদের সঙ্গে আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক ছিল না।

কোটা আন্দোলনের সময় ১৯ এবং ২৭ জুলাই বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী ক্যাডারদের গুলিতে তিন শতাধিক মানুষ নিহত হন। হতাহতদের মধ্যে শিক্ষার্থী ও শিশুসহ বিভিন্ন পেশার সাধারণ মানুষ ছিল।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

আরো দুই সমন্বয়ককে তুলে নেয় ডিবি, সরকারের নির্মম দমন-পীড়ন

আপডেট সময় : ০১:৩৬:৪৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৭ জুলাই ২০২৫
জাতীয় ডেস্ক: সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সরকারি বাহিনীর নৃশংসতার মাঝেই ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই আরো দুই শীর্ষ সমন্বয়ক সারজিস আলম এবং হাসনাত আবদুল্লাহকে তুলে নেয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এর আগে গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শীর্ষ সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং আবু বাকের মজুমদারকে তুলে নিয়েছিল ডিবি।

ডিবির তৎকালীন অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. জুনায়েদ আলম সরকার তখন বলেছিলেন, ‘গত কয়েক দিনে ঘটে যাওয়া সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও সহিংসতার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার স্বার্থে এই পাঁচজনকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।’

শীর্ষ সমন্বয়কদের তুলে নেওয়ার মাঝেই সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার করে আদালতের রায়ের পর সরকারের জারি করা প্রজ্ঞাপন প্রত্যাখ্যান করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে সমন্বয়করা সরকারকে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটামও দেন। তাদের নতুন তিন দাবি ছিলÑনাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদসহ আটক সব শিক্ষার্থীর মুক্তি, আন্দোলনের নামে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহার এবং শিক্ষার্থী গণহত্যার সঙ্গে জড়িত মন্ত্রী থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত দায়ী সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ।

আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক মাহিন সরকার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘সরকার দাবি করছে আন্দোলনের মূল দাবি মানা হয়েছে। কিন্তু আমরা দাবি করেছিলাম একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করে সমস্যার সমাধান করতে হবে। সেটি হয়নি। তাই প্রজ্ঞাপন প্রত্যাখ্যান করছি।’

অন্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেছিলেন, ‘এখন পর্যন্ত তিন হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দাবি মানা না হলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।’

সারা দেশে দেয়াল লিখন ও প্রচার কর্মসূচি

অন্তর্বর্তী কর্মসূচি হিসেবে ২৮ জুলাই থেকে সারা দেশে অনলাইন ও অফলাইন মাধ্যমে প্রচার, দেয়াল লিখন ও গ্রাফিতি কর্মসূচি শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন দূতাবাসে দলিল পেশের উদ্যোগ নেওয়া হয়। অপরদিকে আহত ও নিহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি এবং তাদের পরিবারকে আর্থিক ও মানসিক সহায়তার জন্য ‘হেলথ ফোর্স’ ও ‘লিগ্যাল ফোর্স’ গঠন করার কথাও বলা হয়।

শিক্ষক ও মানবাধিকার সংগঠনের উদ্বেগ

ডিবি হেফাজতে নেওয়া পাঁচ সমন্বয়কের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষার্থী থাকায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ২৭ জুলাই বিকালে ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক’-এর ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ডিবি কার্যালয়ে যায় তাদের খোঁজ নিতে। দীর্ঘ অপেক্ষার পরও তারা ডিবিপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেননি।

শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে শিক্ষকরা কঠোর অবস্থান নেন। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ (এইচআরএফবি) উদ্বেগ প্রকাশ করে শিক্ষার্থীদের প্রতি হয়রানি ও নির্যাতন বন্ধে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানায়।

সরকার ও বিরোধীদের বিবৃতি

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাসপাতালে গিয়ে আহতদের চিকিৎসার খোঁজখবর নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতি বিষোদ্গার করে বলেন, ‘দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করার উদ্দেশ্যেই এ সহিংসতা চালানো হয়েছে।’

অপরদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রের দমননীতির নিন্দা করে সরকারের পদত্যাগ দাবি করেন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশ জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারকে চিঠি লিখে বাংলাদেশে চলমান সহিংসতা ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি এবং শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতে দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান জানান।

শেখ হাসিনার সরকারের দমন-পীড়ন সত্ত্বেও ছাত্র সংগঠনগুলো দেশব্যাপী প্রতিবাদ আন্দোলন অব্যাহত রাখে। জুলাইয়ের শেষভাগে কোটা সংস্কার আন্দোলনের বিরুদ্ধে সরকারের দমন-পীড়ন ও সহিংসতা তীব্র হয়ে ওঠে। ১১ দিনে ৯ হাজার ১২১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদের মধ্যে দুই হাজার ৫৩৬ জনকে ঢাকায় এবং ৩৯৬ জনকে গাজীপুরে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারদের মধ্যে অনেকেই নিরীহ ব্যক্তি, যাদের সঙ্গে আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক ছিল না।

কোটা আন্দোলনের সময় ১৯ এবং ২৭ জুলাই বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী ক্যাডারদের গুলিতে তিন শতাধিক মানুষ নিহত হন। হতাহতদের মধ্যে শিক্ষার্থী ও শিশুসহ বিভিন্ন পেশার সাধারণ মানুষ ছিল।