একজন মেহেরিন, তাদের বাবা–মা এবং আমাদের সামাজিক দায়িত্ব
- আপডেট সময় : ০৩:৫৪:১৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ জুলাই ২০২৫ ৮৭ বার পড়া হয়েছে
প্রসঙ্গ অনলাইন ডেস্ক: “একজন নারীর দীপ্তি তখনই স্বর্গের তারার চেয়েও উজ্জ্বল হয় যখন সদগুণ এবং বিনয় তার আকর্ষণকে আলোকিত করে।”
মেহেরীন—কথাবার্তায় মনে হয়, ওয়েস্টার্ন কালচারের মোহ তাকে আচ্ছন্ন করেছে। সে বাবা–মায়ের নামে পারিবারিক সুরক্ষা আইনে মামলা দায়ের করেছে। সে মুক্ত হতে চায়—চায় বিখ্যাত সেলিব্রিটি হতে।
মেহেরীনের বাবা–মা কী চাইছিলেন? তারা সম্ভবত চাইছিলেন, তাদের একমাত্র সন্তান—যাকে তারা ওয়েস্টার্ন শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন—সে যেন বিনয় ও সদগুণ দিয়ে সমাজে আলো ছড়ায়। তারা চেয়েছিলেন, সে যেন মডেস্টি দিয়ে সমাজকে আলোকিত করে।
আসুন একটু ফিরে তাকাই বাবা–মায়ের দায়িত্ব ও কর্তব্যের দিকে।
সন্তানের মানবিক বিকাশে মা এবং বাবা উভয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তারা একে অপরের পরিপূরক। তাদের উভয়ের উপস্থিতি ও সঠিক দিকনির্দেশনা শিশুর মানসিক, সামাজিক, নৈতিক ও আবেগগত বিকাশে গভীর প্রভাব ফেলে।
সংগত কারণেই জন্ম দেওয়া থেকে শুরু করে লালন–পালনের মূল দায়িত্ব সাধারণত মায়েদের কাঁধে থাকে। যদিও মা ও বাবার দায়িত্ব আলাদা করার সুযোগ নেই, তবু বাস্তবে তা কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির —- সন্তানের আবেগগত সংযোগ, প্রাথমিক সামাজিকীকরণ, মানসিক বিকাশ এবং সমর্থন প্রায়শ মায়েদের মাধ্যমেই হয়। অন্যদিকে শৃঙ্খলা, প্রেরণা, আত্মবিশ্বাস, দৃঢ়তা ও রোল মডেল হিসেবে বাবার ভূমিকা অনেক বেশি।
সন্তানের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, সহযোগিতা, সম্পর্কের শিক্ষা ও মানসিক স্থিতিশীলতা গড়ে ওঠে মা–বাবার সম্মিলিত অবদানে।
আবার ফিরে আসি মেহেরীন ও তার বাবা–মায়ের প্রসঙ্গে। কেন এমন হলো? আমাদের খুঁজে বের করতে হবে এর মূল কারণগুলো—একটি সুস্থ সমাজ বিনির্মাণের তাগিদেই।
অধরণের সমস্যাগুলোর শুরু হয় সোশ্যালাইজেন (প্রাইমারী, সেকেন্ডারি, টার্সিয়ারি) প্রসেসের তারতম্যের মধ্য দিয়ে (একটা সন্তানের জন্ম থেকে একটা বয়স পর্যন্ত বিকাশ এর প্রক্রিয়া), এর বিষ্ফোরন ঘটে সোশ্যাল ডিস্টার্বেন্স এর মধ্য দিয়েই এবং শেষ হয় সোশ্যাল জাষ্টিস এর মধ্য দিয়েই।
আমাদের বুঝতে হবে—কেবল সন্তানকে শিক্ষিত করে তোলা যথেষ্ট নয়, তার হৃদয় ও মনকে মানবিক গুণাবলিতে ভরিয়ে তোলাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার ও সমাজকে মিলেই এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে মেহেরীনের মতো সন্তানরা বিদ্রোহ নয়, বরং ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ দিয়ে নিজেদের জায়গা খুঁজে নেবে।
আমরা মেহেরীনের ঘটনায় সহজেই তর্জনী তুলতে পারি তার ওপর, বা তার বাবা–মায়ের ওপর। কিন্তু আমাদের উচিত এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া—এটি ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং আমাদের সমষ্টিগত ব্যর্থতার প্রতিফলন।
একটি শিশুকে শুধু ভালো স্কুলে পড়ানোই যথেষ্ট নয়, তাকে ভালো মানুষ বানানোর জন্য আমাদের ভালো উদাহরণ হতে হয়। তাকে শেখাতে হয় যে স্বাধীনতা মানেই দায়িত্বশীলতা, আর স্বপ্ন মানেই আত্মমর্যাদা ও মূল্যবোধ ধরে রেখে এগিয়ে যাওয়া।
আমাদের সমাজকে এমন হতে হবে যেখানে সন্তানদের কণ্ঠস্বর শোনা হবে, তাদের আত্মসম্মান রক্ষা পাবে, কিন্তু একই সঙ্গে তারা বুঝবে—বাবা–মায়ের ভালোবাসা আর শাসনও তাদের মঙ্গল কামনা থেকেই আসে।
একটি সুস্থ সমাজ তখনই গড়ে ওঠে যখন পরিবার, সমাজ এবং প্রতিষ্ঠানসমূহ মিলে সন্তানদের ভেতরে নৈতিকতা, সহমর্মিতা, আত্মসম্মান ও বিনয় রোপণ করে। যেখানে সম্পর্কগুলো হবে দায়িত্বশীলতার সেতু, কোনো বন্দিশালা নয়।
মেহেরীনের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সন্তান আর বাবা–মায়ের সম্পর্ক ভেঙে পড়া মানে কেবল একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, বরং আমাদের সামাজিক বন্ধনেরও অবক্ষয়। তাই আসুন, আমাদের সন্তানদের এমন শিক্ষা ও ভালোবাসা দিই, যাতে তারা কখনো সমাজকে আঘাত না করে, বরং আলোকিত করে।
একটি সমাজ তখনই সত্যিকারের সভ্য হয় যখন এর প্রতিটি সন্তান এবং প্রতিটি বাবা–মা একে অপরের সঙ্গে আস্থা, ভালোবাসা এবং মানবিক গুণাবলিতে জড়িয়ে থাকে। সেই সমাজ গড়ার দায় আমাদের সবার।
“রাব্বানা হাবলানা মিন আযওয়া-জিনা অযুররিয়্যা-তিনা কূররাতা আ’য়্যুন, অজআলনা লিলমুত্তাকীনা ইমামা।”





















