ড. ইউনূসের পদত্যাগের গুঞ্জন, পরিস্থিতি নিয়ে যা বলছে রাজনৈতিক দল ও উপদেষ্টারা
- আপডেট সময় : ১২:৩৫:২২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ মে ২০২৫ ১০৯ বার পড়া হয়েছে
গতকাল সন্ধ্যায় বিএনপি অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু ‘বিতর্কিত উপদেষ্টা’কে সরানোর দাবি তুলেছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার স্বার্থে বিতর্কিত কয়েকজন উপদেষ্টা, যাদের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে, এমন উপদেষ্টাদের সরিয়ে দেওয়ার দাবি আমরা তুলেছিলাম।’ তিনি বিশেষ করে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সাম্প্রতিক বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে অভিযোগ করে তাঁকেও অব্যাহতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এর আগে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের পদত্যাগের দাবিতে ঢাকার রাজপথে বিক্ষোভ করেছেন বিএনপির নেতা ইশরাক হোসেন। ১৪ মে থেকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র হিসেবে ইশরাক হোসেনকে শপথ পড়ানোর দাবিতে এই আন্দোলন শুরু হয়। পরে সেই আন্দোলন এই দুই উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবিতে রূপ নেয়। ইশরাককে মেয়র হিসেবে শপথ নেওয়ার আদেশ চ্যালেঞ্জ করে করা রিট উচ্চ আদালত খারিজ করার পর ইশরাক আন্দোলন স্থগিত করেছেন। তবে দুই উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবি থেকে তিনি সরেননি।
এদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একজন শীর্ষ নেতা অন্তর্বর্তী সরকারের তিন উপদেষ্টাকে ‘বিএনপির মুখপাত্র’ আখ্যা দিয়ে পদত্যাগে বাধ্য করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। সেই সঙ্গে তাঁরা বিচার বিভাগে বিএনপির হস্তক্ষেপের অভিযোগও তুলেছেন। তাঁরা নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের দাবিতে কর্মসূচিও পালন করেছেন।
উপদেষ্টাদের মন্তব্য ও আত্মপক্ষ সমর্থন
এই ডামাডোলের মধ্যেই স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ গতকাল ফেসবুকে একটি বিস্ফোরক স্ট্যাটাস দেন। তিনি লেখেন, ‘বিএএল, নর্থ ও দিল্লি জোটভুক্ত হয়ে যে কুমির ডেকে আনছেন তা আপনাদেরকেই খাবে।’ বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘নর্থ’ বলতে সাধারণত ক্যান্টনমেন্ট বোঝানো হয়। ‘বিএএল’ হলো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সংক্ষিপ্ত রূপ। আসিফ আরও যোগ করেন, ‘গণতান্ত্রিক রূপান্তর আর এদেশের মানুষের ভাগ্য কোনোটাই ইতিবাচক পথে যাবে না আরকি। স্বপ্ন দেখে স্বপ্নভঙ্গের কষ্টই বোধ হয় এদেশের ভাগ্য।’
অন্যদিকে তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগের যেকোনো বিভাজনমূলক বক্তব্য ও শব্দচয়নের কারণে দুঃখপ্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘ব্যক্তির আদর্শ, সম্মান ও আবেগের চেয়ে দেশ বড় দেশপ্রেমিক শক্তির ঐক্য অনিবার্য।’ তিনি অভ্যুত্থানের সব শক্তির প্রতি সম্মান ও সংবেদনশীলতা রেখে কাজ করার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে বলেন, ‘বাংলাদেশের শত্রুরা ঐক্যবদ্ধ ও আগ্রাসী। সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক সব প্রতিষ্ঠান হুমকির মুখে।’
অভ্যুত্থানের ঐক্য ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের নবগঠিত দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘আমরা সবাই এক হয়েছিলাম বলে দীর্ঘ দেড় যুগের শক্তিশালী ফ্যাসিবাদকে তছনছ করতে পেরেছিলাম। আমরা খণ্ডবিখণ্ড হলে পতিত ফ্যাসিবাদ ও তার দেশি-বিদেশি দোসরেরা আমাদের তছনছ করার হীন পাঁয়তারা করবে।’ তিনি দেশ ও জাতির স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকার ওপর জোর দেন।
গণ-অভ্যুত্থানের আরেক মুখ বর্তমানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র উমামা ফাতেমা আজ ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেন, ‘দেশ কোনো ধরনের রাজনৈতিক ঐক্যের পথে নাই। এই ঐক্য ভেঙে গেছে গত সেপ্টেম্বর, অক্টোবরের দিকেই। খোলসটা ছিল একরকমভাবে। বর্তমানে খোলসটাও খুলে পড়ছে, তাই অনেকে অবাক হচ্ছে। সব পক্ষ যদি কিছুটা পরিপক্বতা দেখাত, শহীদদের জীবনের কথা ভেবে কিছুটা ছাড় দিত তাহলে অন্তত ইলেকশনের আগপর্যন্ত দেশটা স্ট্যাবল থাকত। দেশটা স্ট্যাবল না হতে দেওয়ার জন্য অনেক ধরনের ফোর্স ভেতরে সক্রিয় আছে। আর জুলাই এর সকল লড়াকু শক্তিই ক্ষমতা প্রশ্নে অস্থির হয়ে গেছে। যেন গোটা দেশটাই একটা খেলামাত্র।’
রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও টেবিলে ঐকমত্যের রাজনীতিই দেশকে একটা গণতান্ত্রিক উত্তরণের দিকে নিতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
উদ্ভূত পরিস্থিতির পুরো দায় অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর দিয়েছেন বিএনপি নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি লিখিত বক্তব্যে বলেছেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষ করা যাচ্ছে যে জন–আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সরকারের যা করণীয়, তা যথাসময়ে না করে চাপের মুখে করার সংস্কৃতি ইতিমধ্যেই সরকারের সক্ষমতা ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছে এবং অন্যদেরও একই প্রক্রিয়ায় দাবি আদায়ের ন্যায্যতা প্রদান করেছে। এই অনভিপ্রেত ও বিব্রতকর পরিস্থিতির দায় পুরোটাই সরকারের।’
খন্দকার মোশাররফ হোসেন জানান, সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা বিষয়গুলো বিএনপির আগের প্রস্তাব ও পরামর্শের মতো উপেক্ষিত হলে অনিবার্যভাবেই অন্তর্বর্তী সরকারকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে কি না, তা পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হবেন তাঁরা।
বিএনপি মনে করছে, মেয়র হিসেবে ইশরাক হোসেনের শপথের দাবিতে ১৪ থেকে ২২ মে পর্যন্ত ৯ দিন রাজধানীতে কর্মী–সমর্থকদের টানা উপস্থিতির মাধ্যমে মাঠের রাজনীতিতে শক্তি দেখাতে পেরেছে তারা। এর মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারকে আরও বেশি চাপে ফেলা গেছে। এ ছাড়া ইশরাককে মেয়র পদে শপথের পক্ষে উচ্চ আদালতের রায়কেও ‘জয়’ হিসেবে দেখছেন বিএনপির নেতারা। তাঁরা এবার আগামী ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচন আদায়ের লক্ষ্যে ঈদুল আজহার পর রাজপথে কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে চান।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রধান উপদেষ্টার পদত্যাগের গুঞ্জন ও উপদেষ্টাদের নিয়ে চলমান বিতর্ক অন্তর্বর্তী সরকারের স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অর্জিত ঐক্যে ফাটল ধরলে তা দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।





















