পর্দার অন্তরালে
- আপডেট সময় : ১১:৩৩:৪৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ মে ২০২৫ ৯৩ বার পড়া হয়েছে
প্রফেসর ড. শেখ আকরাম আলী: প্রত্যেক ঘটনারই একটি পটভূমি থাকে—তা চোখে দেখা যাক বা না-যাক। এই পটভূমি অনুসারেই ঘটনা ঘটে, পরিকল্পনাকারীর ছকে। পরিকল্পনাকারীরা কখনো সামনে থাকেন, কখনো থাকেন পর্দার অন্তরালে। এই পরিকল্পনার ফল সমাজে ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক—উভয়ই হতে পারে। এটি ব্যক্তি জীবন, সামাজিক পরিসর এবং জাতীয় ক্ষেত্র—সবখানেই প্রযোজ্য।
আমরা আমাদের জাতীয় জীবনে এইরকম অভিজ্ঞতা একাধিকবার পেয়েছি।
প্রথম বড় অভিজ্ঞতা ছিল ভারতবর্ষের মুসলিম জনগণের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠনের আন্দোলন। সেই আন্দোলনে নেতৃত্ব ও উদ্দেশ্য—সবকিছু ছিল জনগণের চোখের সামনে। মানুষ এই আন্দোলনে উজ্জীবিত হয়েছিল। ব্রিটিশ সরকার মুসলিম লীগের দাবি মেনে নিয়ে ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগে সম্মত হয়। মুসলিম লীগের দৃশ্যমান ও প্রকাশ্য কার্যক্রমের মাধ্যমে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম সম্ভব হয়েছিল। ১৯৪৭ সালের বিভাজন দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে এক গৌরবময় ও যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।
দ্বিতীয় অভিজ্ঞতা ছিল ১৯৭১ সালে। তবে ২৫শে মার্চের আগপর্যন্ত এই ঘটনার পেছনের বাস্তবতা ছিল অনেকটাই অজানা। তখনকার পরিকল্পনাকারীরা দৃশ্যমান ছিলেন, কিন্তু তাদের পরিকল্পনা ছিল গোপন। স্বাধীনতা আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু সাধারণ মানুষের কাছে পরিষ্কারভাবে প্রকাশিত হয়নি। এই আন্দোলনের গোপন পর্দার অন্তরালের গল্প এখনও গবেষণার বিষয় হয়ে আছে। কিন্তু আজও আমরা স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস জানি না, কিংবা জানার আগ্রহও তেমনভাবে তৈরি হয়নি। একটি জাতির জন্য এটি গভীর দুর্ভাগ্যজনক বিষয়। সত্য ইতিহাস জানানো রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। আর কতকাল জাতি অন্ধকারে থাকবে? ইতিহাস লেখা এখন সময়ের দাবি।
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব আমাদের তৃতীয় অভিজ্ঞতা। অনেকেই একে বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতা বলে অভিহিত করেছেন। এই বিপ্লব শুধু শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসন থেকে নয়, বরং ভারতের প্রভাব-নির্ভর নিয়ন্ত্রণ থেকেও দেশের মুক্তির পথ উন্মুক্ত করেছে। শুরুতে এটি ছিল কর্মসংস্থানে বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ, কিন্তু অচিরেই তা রূপ নেয় সর্বজনীন গণঅসন্তোষে এবং শেষ পর্যন্ত শাসনব্যবস্থার পতনে। কেউ জানতো না কারা এর নেপথ্যে কাজ করছে। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে পরিস্থিতি এমন অবস্থায় পৌঁছে যায় যে, সরকারের পদত্যাগ প্রায় অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়।
৫ই আগস্ট ২০২৪ বিপ্লব বিজয়ের রূপ নেয়—এ যেন এক অপ্রত্যাশিত বাস্তবতা। এখানে একটি ‘মাস্টারমাইন্ড’ ছিল—ড. ইউনুসের ভাষায়, তিনি হলেন মাহফুজ আলম। তবে বাস্তবতাও বলছে, হয়তো আরও কেউ পর্দার অন্তরালে থেকে আন্দোলনকে নৈতিক সহায়তা দিয়েছেন। আজ পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে—তাঁর উপস্থিতি সরকার ব্যবস্থার মধ্যেও রয়েছে।
আমরা জানি, ১৯৭১ পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশেও কিছু মহল সবসময় রাজনীতিকে পর্দার অন্তরাল থেকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমরা কখনও সাহস করে সেই আধিপত্যবাদী রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারিনি। কিন্তু এখন, জুলাই বিপ্লবের পর, জনগণ প্রস্তুত। কিন্তু রাজনীতিকদের মধ্যে এখনও দেখা যাচ্ছে আপোষের প্রবণতা—ক্ষমতায় থাকতে বা যেতে তারা জাতীয় স্বার্থকেও উপেক্ষা করছেন। এটি একটি জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক অবস্থা।
জুলাই বিপ্লবের পর রাজনৈতিক বাস্তবতা অনেক বদলে গেছে। কিন্তু ভারত এখনও তার নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করার চেষ্টায় আছে। তারা কখনো সামরিক, কখনো কূটনৈতিক, আবার কখনো অর্থনৈতিক পথ বেছে নিচ্ছে। সম্প্রতি তারা বাংলাদেশি পণ্যের ওপর অবরোধও দিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ড. ইউনুস এখন পর্যন্ত প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সাহসিকতা ও বিচক্ষণতায় আচরণ করেছেন। পুরো জাতি তার পাশে রয়েছে। মানুষ তার সফলতা নিয়ে আশাবাদী।
সম্প্রতি কিছু ইস্যু নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে। যেমন—বিদেশি কোম্পানির মাধ্যমে বন্দর পরিচালনা। এটি বিশ্বজুড়ে একটি প্রচলিত ব্যবস্থা, কিন্তু অবশ্যই সে দায়িত্ব দেওয়া উচিত তাদের, যাদের এ বিষয়ে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা রয়েছে। জনসাধারণের কাছে শর্তাবলী স্বচ্ছ থাকা উচিত—তাতে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। বরং ভবিষ্যতের উন্নত ব্যবস্থাপনা ও লাভবান হওয়ার আশাই করা যায়।
আরাকানবাসীর জন্য মানবিক করিডোর প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব বাংলাদেশে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। জনগণ এই প্রকল্পের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু বর্তমান ‘পর্দার অন্তরালের নায়িকা’ এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে চাপে রাখবে—এমন আশঙ্কা রয়েছে। চীন এই প্রকল্পকে কখনোই সমর্থন করবে না, আর যুক্তরাষ্ট্র হবে খুশি। বাংলাদেশের জন্য এটি এক কঠিন দোলাচলের জায়গা। এখান থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও কৌশলী কূটনীতি।
ঢাকা সেনানিবাস ও প্রেস ক্লাব ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি জাতির জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত ও বঞ্চিত সেনাসদস্যরা রাস্তায় নেমে তাদের দাবিদাওয়া জানাচ্ছেন। এটা স্পষ্ট যে, কেউ কেউ পর্দার অন্তরালে সেনাবাহিনীকেও ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে বিবেচনার সঙ্গে বিষয়টি সমাধান করতে হবে।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের উচিত সরকারকে সহায়তা করা—এই স্থায়ী ‘মাস্টারমাইন্ড’ ও বর্তমান ‘মাস্টারমাইন্ড’ যেন আর জাতিকে বিভ্রান্ত করতে না পারে। সরকার ও অংশীদারদের উচিত একত্রে কাজ করে দেশের ভবিষ্যতের জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা।
কেউ এককভাবে ‘চ্যাম্পিয়ন’ নন—সবাইকে হতে হবে দেশপ্রেমিক শক্তি, দেশের মঙ্গলের জন্য। কারণ জাতি আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যা অতীতে কখনো দেখেনি। এখন জাতীয় ঐক্য ও জাতীয় সরকার গঠনের বিকল্প নেই।





















