স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহীতে একদিকে বাড়ছে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা, অন্যদিকে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের ব্যয়ও বাড়ছে। চিকিৎসা অবকাঠামোর এই সম্প্রসারণের সঙ্গে সেবার মান, পর্যাপ্ত জনবল ও রোগীর ভোগান্তি কতটা কমছে—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র রাজশাহী। রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও আশপাশের অঞ্চল থেকে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ চিকিৎসার জন্য নগরীতে আসেন। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারও গড়ে উঠেছে নগরীর বিভিন্ন এলাকায়।
তবে রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল। ১ হাজার ২০০ শয্যার হাসপাতালটিতে বিভিন্ন সময়ে ধারণক্ষমতার দুই থেকে তিন গুণেরও বেশি রোগী ভর্তি থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। চলতি বছরের মে মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ৩ হাজার ৫০০ রোগীর চিকিৎসার কথা উল্লেখ করা হয়। রোগীর চাপের তুলনায় জনবল ও অবকাঠামো পর্যাপ্ত না হওয়ায় অনেক সময় ওয়ার্ডের মেঝে ও বারান্দাতেও রোগীদের চিকিৎসা নিতে হয়। এর ফলে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় অবকাঠামো সম্প্রসারণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে রামেক হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা ১ হাজার ২০০ থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৩০০ করার প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বর্ধিত শয্যায় আইসিইউ সেবা চালুর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
রাজশাহীর স্বাস্থ্যসেবা খাতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বড় একটি স্বাস্থ্যসেবা-নির্ভর বাজার। ফলে চিকিৎসার সুযোগ বাড়লেও রোগী ও স্বজনদের ব্যয়ের বিষয়টি সামনে আসছে।
একজন রোগীর চিকিৎসা ব্যয় শুধু চিকিৎসকের ফি কিংবা হাসপাতালের বিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ, যাতায়াত, খাবার ও থাকার খরচ। দূরবর্তী জেলা থেকে আসা রোগীদের ক্ষেত্রে এই ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু হাসপাতালের সংখ্যা বা আধুনিক যন্ত্রপাতি বাড়লেই চিকিৎসার মান নিশ্চিত হয় না। এর সঙ্গে প্রয়োজন দক্ষ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত নার্স, পর্যাপ্ত জনবল, সঠিক রোগ নির্ণয়, আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার এবং রোগীবান্ধব ব্যবস্থাপনা।
এদিকে রামেক হাসপাতালে রোগীর চাপের পাশাপাশি জনবল সংকটের বিষয়টিও দীর্ঘদিনের। ২০২৬ সালের জানুয়ারির এক প্রতিবেদনে হাসপাতালটির ১ হাজার ২০০ শয্যার বিপরীতে ২ হাজার ৫৩৭ রোগী চিকিৎসাধীন থাকার তথ্য উঠে আসে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, শয্যা বাড়ানো হলেও সে অনুযায়ী জনবল বাড়ানো হয়নি।
ফলে রাজশাহীতে চিকিৎসা অবকাঠামোর সম্প্রসারণের পাশাপাশি এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সেবার মান নিশ্চিত করা। রোগীর সংখ্যা বাড়ছে কি না—তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে রোগীরা কতটা নিরাপদ, দ্রুত, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসা পাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতেই নিয়মিত তদারকি, চিকিৎসা ব্যয়ের স্বচ্ছতা, পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিতকরণ এবং রোগীর অধিকার রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
রাজশাহীকে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে শুধু হাসপাতাল ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানো নয়, একই সঙ্গে চিকিৎসার মান ও মানুষের সামর্থ্যের বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলেই স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ সাধারণ মানুষের জন্য প্রকৃত সুফল বয়ে আনবে।



















