রাজশাহী আদালত চত্বরে বাদাম বিক্রি করে পরিবারের হাল ধরেছেন শারীরিক প্রতিবন্ধী সোহেল
- আপডেট সময় : ১২:৩৮:৩৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬ ৭০ বার পড়া হয়েছে
আসেফ আবিদ: একটি হাত প্রায় অকেজো, সোজা হয়ে হাঁটতেও পারেন না। তবুও কারও কাছে হাত পাতেন না। আত্মসম্মানকে সম্বল করে প্রতিদিন রাজশাহী আদালত চত্বরে ঘুরে ঘুরে বাদাম, ছোলা ও মটর ভাজা বিক্রি করেই চলছে শারীরিক প্রতিবন্ধী সোহেলের জীবনের সংগ্রাম।
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার হলিদাগাছি গ্রামের বাসিন্দা সোহেলের পরিবারে রয়েছেন পাঁচজন সদস্য। অনেক আগেই বাবা মারা যাওয়ায় পরিবারের দায়িত্ব এখন তার কাঁধে। দুই ছেলেকে শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন নিয়েই প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করেন তিনি।
সোহেল জানান, ভিক্ষাবৃত্তিকে কখনোই নিজের জীবিকার পথ হিসেবে বেছে নিতে চাননি। প্রতিবন্ধী ভাতার টাকা দিয়ে ছোট পরিসরে বাদামের ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমানে সেই ব্যবসাই তার পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস।
প্রতিদিন বানেশ্বর বাজার থেকে ছোলা, মটর ও বুট কিনে বাড়িতে নিয়ে যান। পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতায় সেগুলো ভেজে প্যাকেটজাত করা হয়। এরপর সকালে ট্রেনে করে রাজশাহী আদালত চত্বরে এসে আদালতের কার্যক্রম শুরুর আগেই বিক্রি শুরু করেন।
প্রতিদিন প্রায় দেড় শতাধিক প্যাকেট নিয়ে এলেও অধিকাংশ দিনই সব বিক্রি হয়ে যায়। আদালতের বিভিন্ন ভবনের নিচতলা থেকে শুরু করে ওপরের তলা পর্যন্ত সিঁড়ি বেয়ে ঘুরে ঘুরে পণ্য বিক্রি করেন তিনি। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে চলাফেরায় কষ্ট হলেও জীবিকার তাগিদে প্রতিদিনই এ পরিশ্রম করে চলেছেন।
আদালত চত্বরে সব পণ্য বিক্রি না হলে বিকেলে সাহেববাজার এলাকায় ঘুরে অবশিষ্ট পণ্য বিক্রি করেন। সকালেই বাড়ি থেকে বের হন, আর ফিরতে ফিরতে রাত নয়টারও বেশি বাজে।
নিজের সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে সোহেল বলেন, “ভিক্ষা করা আমার কাছে অসম্মানের। তাই প্রতিবন্ধী ভাতার টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করেছি। প্রতিদিন ১,৫০০ থেকে ১,৮০০ টাকার পণ্য নিয়ে আসি। সিঁড়ি ভাঙতে খুব কষ্ট হয়, কিন্তু কাজ তো করতেই হবে। পেট চালানোর জন্য এর বিকল্প নেই। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে অন্য কোনো কাজও করতে পারি না।”
তিনি আরও জানান, আদালত কিংবা বাইরে অনেকেই তার কাছ থেকে বাকিতে পণ্য নিলেও আজ পর্যন্ত কেউ তার টাকা আত্মসাৎ করেননি।
আদালতে কর্মরত ও আগত অনেকেই সোহেলের কাছ থেকেই নিয়মিত বাদাম ও ছোলা কিনে থাকেন। এতে যেমন সোহেলের আয় হয়, তেমনি আদালত চত্বরে অবস্থানরত মানুষও সহজেই মুখরোচক খাবার পেয়ে যান। নিয়মিত ক্রেতা অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আজম বলেন, “বর্তমানে অনেক সুস্থ-সবল মানুষও সহজ পথে আয়ের চেষ্টা করেন। কিন্তু সোহেল শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তার এই আত্মসম্মানবোধ ও পরিশ্রম আমাদের অনুপ্রাণিত করে।”
আরেক ক্রেতা নাজমুল হোসেন জুয়েল বলেন, “প্রতিদিন আদালতে আসার আগেই তাকে দেখতে পাই। চারঘাট থেকে এত দূর এসে কষ্ট করে তিনি পণ্য বিক্রি করেন। তাই সুযোগ পেলেই তার কাছ থেকে কিছু কিনি। অন্যদেরও তার কাছ থেকে কেনাকাটা করার আহ্বান জানাই।”
শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে বাধা নয়, বরং আত্মসম্মান ও কঠোর পরিশ্রমকে শক্তি হিসেবে বেছে নিয়ে সোহেল প্রতিদিন সংগ্রাম করে চলেছেন। তার এই জীবনসংগ্রাম সমাজে আত্মনির্ভরশীলতার এক অনুপ্রেরণাদায়ক উদাহরণ হয়ে উঠেছে।




















