ঢাকা ০৫:৪৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
সিটি কলেজে নতুন কমিটিকে প্রত্যাখ্যান: অবাঞ্ছিত ঘোষণা রাজশাহী কলেজে ব্রাজিল সমর্থকদের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা অত্যন্ত সুকৌশলে ১১ দলীয় জোটকে ক্ষমতার বাইরে রাখা হয়েছে : অলি আহমদ বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে সুইডেনের রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ কওমি মাদরাসার বাজেট ইস্যু-বিএনপি কোনো কওমের জন্য কাজ করে না : নিলোফার চৌধুরী মনি বগুড়ায় শিশু রিফাত হত্যার ঘটনায় ৫ জনের ফাঁসি, ৫ জনের কারাদণ্ড বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে রাজশাহী কলেজে আলোচনা সভা ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে জামায়াত: সেলিম উদ্দিন মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় দুবাই ভিসা, ৪ হাজারে মিলছে থাকার হোটেল মামুনুল হককে নিয়ে আলোচনা: নিজের বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করলেন স্পিকার

দিন ও রাতের আবর্তন, সূর্য–চন্দ্রের গতিপথ

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:১২:৫০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৫ ৪৮ বার পড়া হয়েছে

ড. এমজি মোস্তফা মূসা: সূরা ইয়াসীন (৩৭–৪০)-এর এক গভীর, জ্ঞানসমৃদ্ধ ও বহুমাত্রিক অংশ যেখানে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা মহাবিশ্বের নিয়ম, সৌর, চন্দ্র, রাত্রি, দিনের আবর্তন এবং সৃষ্টির নিরবচ্ছিন্ন গতিশীলতা দ্বারা নিজের কুদরতের নিদর্শন তুলে ধরেছেন। এখানে বিজ্ঞান, দর্শন, ও ঈমান তিনটি জ্ঞানের স্তর একত্রে মিশে আছে।

১. সূরা ইয়াসীন: আয়াত ৩৭–৪০:

আয়াতসমূহের সারমর্ম: আল্লাহ বলেন, রাত্রি তাদের জন্য একটি নিদর্শন; আমরা দিনকে এর মধ্য থেকে সরিয়ে নেই, তখন তারা অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। সূর্য নিজ নির্দিষ্ট পথে প্রবাহিত হচ্ছে, এটি পরাক্রমশালী ও সর্বজ্ঞ আল্লাহর নির্ধারিত পরিকল্পনা। চন্দ্রের জন্য আমরা নির্দিষ্ট পর্যায় স্থির করেছি, যতক্ষণ না তা পুরোনো খেজুর শাখার মতো বাঁকা হয়ে যায়। সূর্য কখনো চন্দ্রকে অতিক্রম করতে পারে না, রাতও কখনো দিনের পূর্বে আসে না; প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে সাঁতার কাটছে।

২. বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ:

(ক) দিন ও রাতের আবর্তন, পৃথিবীর ঘূর্ণন: আমরা দিনকে সরিয়ে নেই, এই শব্দচয়নটি অসাধারণ বৈজ্ঞানিক রূপক। এখানে “খোলস ছাড়ানো” বা “চামড়া তুলে নেওয়া” যেন রাত ও দিন পৃথিবীর চারপাশে পরপর আসা একটি বস্ত্রের মতো। আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যা অনুযায়ী, দিন–রাত্রির আবর্তন ঘটে পৃথিবীর নিজ অক্ষের উপর ঘূর্ণনের কারণে (rotation)। যখন পৃথিবীর একটি অংশ সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে, সেখানে দিন হয়; অপর পাশে রাত। কুরআনের এই আয়াত প্রকাশ করে রাত্রি ও দিনের এই ক্রমান্বয়িক, নিয়ন্ত্রিত এবং সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া।

(খ) সূর্যের চলন ও সৌরকক্ষপথ: সূর্য তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। বিজ্ঞান বলছে সূর্য স্থির নয়; বরং এটি তার সম্পূর্ণ সৌরজগতকে সঙ্গে নিয়ে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রের চারপাশে প্রায় ২২০ কিমি/সেকেন্ড বেগে ঘূর্ণায়মান। এই চলনের চূড়ান্ত গন্তব্য বা বলতে বোঝানো যেতে পারে, হয় সূর্যের অদূর ভবিষ্যৎ শারীরিক স্থিতি (যেমন ভবিষ্যৎ Death Phase বা Solar Collapse), নয়তো কিয়ামতের সময় পর্যন্ত তার নির্ধারিত জীবনচক্র। উভয় ব্যাখ্যাই কুরআনের শব্দের অন্তর্নিহিত বিস্তৃত অর্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

(গ) চন্দ্রের মঞ্জিল বা কক্ষপর্যায়: আমরা চন্দ্রের জন্য নির্দিষ্ট মঞ্জিল নির্ধারণ করেছি। বিজ্ঞান এখন জানে যে চাঁদ পৃথিবীকে কেন্দ্র করে এক মাসে একবার পরিক্রমণ করে, এবং তার প্রতিটি অবস্থান বা ফেজ (new moon, crescent, half, full moon ইত্যাদি) নির্দিষ্ট দূরত্ব ও সূর্যালোকের প্রতিফলনের কারণে ঘটে। কুরআনে বলা হয়েছে, শেষ পর্যায়ে চাঁদ হয় পুরোনো খেজুরের শাখার মতো বাঁকা ও পাতলা। এটি ঠিক সেই waning crescent অবস্থার চিত্র, যা চাঁদের শেষ ফেজে দেখা যায়।

(ঘ) মহাজাগতিক সাঁতার, গতিশীল সৃষ্টিজগৎ: “(প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে সাঁতার কাটছে)। এই আয়াতের “সাঁতার কাটছে” শব্দটি অত্যন্ত অর্থবহ, এটি গতিশীল তরঙ্গ বা তংল গতি (fluid motion) নির্দেশ করে, যেন সব গ্রহ-নক্ষত্র বিশাল মহাকাশের সাগরে ভেসে চলেছে। এটি এক অসাধারণ বৈজ্ঞানিক সত্যের পূর্বাভাস, পুরো মহাবিশ্বই গতিশীল, কিছুই স্থির নয়। সূর্য, চাঁদ, পৃথিবী সবাই ঘূর্ণন, পরিক্রমণ, এবং মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের এক অনন্ত গতির অংশ।

৩. দর্শন, ঈমান ও নৈতিক শিক্ষা:

(ক). নিয়মের সৌন্দর্য: মহাবিশ্বের প্রতিটি জিনিস নির্দিষ্ট আইন ও ভারসাম্যের অধীনে চলছে । এটি প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তিনি সৃষ্টিকর্তা সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান। মানবজীবনেও যদি এই নিয়ম ও ভারসাম্য হারিয়ে যায়, তবে বিশৃঙ্খলা অবশ্যম্ভাবী।

(খ). সময়ের শিক্ষা: দিন ও রাতের পরিবর্তন জীবনের সময়চক্রের প্রতীক, কখনো আলো, কখনো অন্ধকার, কিন্তু উভয়ই প্রয়োজনীয়। যেমন রাত্রি মানুষকে বিশ্রাম দেয়, তেমনি কঠিন সময়ও আত্মশুদ্ধির সুযোগ দেয়।

(গ). ঈমানের দৃষ্টি: যে ব্যক্তি আকাশের এই সুবিন্যস্ততা দেখে চিন্তা করে, তার হৃদয়ে আল্লাহর মহিমা প্রতিষ্ঠিত হয়। কুরআন বারবার আহ্বান করেছে, ” তারা কি আকাশের দিকে তাকায় না, কেমন করে তাকে উঠানো হয়েছে? জ্ঞানের মাধ্যমে ঈমানকে গভীর করা এখানেই উদ্দেশ্য।

৪. উপসংহার: সূরা ইয়াসীনের এই আয়াতসমূহ মহাবিশ্বের মহাজাগতিক নিয়ম ও কুরআনের বৈজ্ঞানিক প্রজ্ঞার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। চতুর্দশ শতাব্দী আগে যখন মানুষ সূর্য, চঁন্দ্র ও দিন-রাতের প্রকৃত কারণ জানত না, তখন কুরআন তা নিখুঁতভাবে ঘোষণা করেছিল। আজকের জ্যোতির্বিদ্যা সেই সত্যের সাক্ষ্য দিচ্ছে। অতএব, এ আয়াত শুধু বৈজ্ঞানিক বর্ণনা নয়, বরং এক গভীর আধ্যাত্মিক আহ্বান, যেন মানুষ আকাশ ও পৃথিবীর সুষম গতির ভেতর আল-কুদরাহ (আল্লাহর ক্ষমতা), আল-হিকমাহ (আল্লাহর প্রজ্ঞা) এবং আল-ইলম (আল্লাহর জ্ঞান) এর পরিচয় লাভ করে।

আধ্যাত্মিক প্রতিফলন ও দো‘আ: আল্লাহর কুদরতের নিদর্শনে ঈমানের জাগরণ: যখন আমরা রাতের আকাশের দিকে তাকাই, দেখি অসংখ্য তারা, সূর্য, চাঁদ, গ্রহ ও নক্ষত্র নিরবধি গতিতে চলছে, তখন বুঝি, এই মহাবিশ্ব কোন বিশৃঙ্খলতার সৃষ্টি নয়, বরং এক পরম প্রজ্ঞা ও পরিকল্পনার প্রতিফলন। দিন ও রাতের এই পরিবর্তন, সূর্যের নির্দিষ্ট পথে গমন, চাঁদের পর্যায়ক্রমিক রূপান্তর, সবই আমাদের শেখায়, জীবনও তেমনি এক সুনির্দিষ্ট চক্র, যেখানে প্রতিটি অবস্থা, প্রতিটি পরিবর্তনই আল্লাহর হিকমাহ (জ্ঞান ও উদ্দেশ্য) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। রাত্রি যেমন মানুষকে বিশ্রাম দেয়, তেমনি জীবনের অন্ধকার সময়ও আত্মশুদ্ধির সুযোগ দেয়। দিন যেমন কর্মের আহ্বান জানায়, তেমনি ঈমানদার জীবন হলো অবিরাম আলোর অনুসন্ধান।

এই নিদর্শনগুলো আমাদের শেখায়, আল্লাহই একমাত্র নিয়ন্তা, বিজ্ঞান তাঁর কুদরতের ভাষা, বিবেক ও বোধই ঈমানের জানালা। যে ব্যক্তি এসব নিয়ে চিন্তা করে, তার অন্তরে সৃষ্টি হয় গভীর ঈমান, নম্রতা, ও তাওহীদের বোধ। আর যে এসব নিদর্শন উপেক্ষা করে, সে যেন এমন এক যাত্রী—যে সূর্যের আলোয় চোখ বন্ধ রাখে।

দো‘আ: আল্লাহ-হুম্মা, হে পরম প্রজ্ঞাময় আল্লাহ, আমাদের অন্তর দৃষ্টি খুলে দাও যেন আমরা তোমার নিদর্শনগুলো দেখতে পারি আকাশে, পৃথিবীতে, নিজের অন্তরে। আমাদের হৃদয়ে এমন জ্ঞান দাও, যা শুধু তথ্য নয়, বরং ঈমানের আলো জ্বালায়। আমাদের জীবনে দিন–রাত্রির ভারসাম্যের মতোই শান্তি ও শৃঙ্খলা দাও। আমাদের কর্মে সূর্যের দৃঢ়তা, চিন্তায় চাঁদের কোমলতা, আর অন্তরে তাকওয়ার উজ্জ্বলতা দান করো।

হে রব্বুল আলামীন, তুমি আমাদেরকে এমন বানাও, যারা তোমার সৃষ্টিতে তোমার অস্তিত্ব চিনে নেয়, এবং এই চিন্তাকে ঈমান, আমল ও দাওয়াতে রূপান্তরিত করে। আমীন, ইয়া রব্বাল ‘আলামীন।

আল্লাহ-হুম্মা সাল্লী, ওয়া সাল্লিম, ওয়া বারিক আ’লা মুহাম্মাদ; আল-হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামীন। (মূসা: ২৫-১০-২৪)

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

দিন ও রাতের আবর্তন, সূর্য–চন্দ্রের গতিপথ

আপডেট সময় : ০৬:১২:৫০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৫

ড. এমজি মোস্তফা মূসা: সূরা ইয়াসীন (৩৭–৪০)-এর এক গভীর, জ্ঞানসমৃদ্ধ ও বহুমাত্রিক অংশ যেখানে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা মহাবিশ্বের নিয়ম, সৌর, চন্দ্র, রাত্রি, দিনের আবর্তন এবং সৃষ্টির নিরবচ্ছিন্ন গতিশীলতা দ্বারা নিজের কুদরতের নিদর্শন তুলে ধরেছেন। এখানে বিজ্ঞান, দর্শন, ও ঈমান তিনটি জ্ঞানের স্তর একত্রে মিশে আছে।

১. সূরা ইয়াসীন: আয়াত ৩৭–৪০:

আয়াতসমূহের সারমর্ম: আল্লাহ বলেন, রাত্রি তাদের জন্য একটি নিদর্শন; আমরা দিনকে এর মধ্য থেকে সরিয়ে নেই, তখন তারা অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। সূর্য নিজ নির্দিষ্ট পথে প্রবাহিত হচ্ছে, এটি পরাক্রমশালী ও সর্বজ্ঞ আল্লাহর নির্ধারিত পরিকল্পনা। চন্দ্রের জন্য আমরা নির্দিষ্ট পর্যায় স্থির করেছি, যতক্ষণ না তা পুরোনো খেজুর শাখার মতো বাঁকা হয়ে যায়। সূর্য কখনো চন্দ্রকে অতিক্রম করতে পারে না, রাতও কখনো দিনের পূর্বে আসে না; প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে সাঁতার কাটছে।

২. বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ:

(ক) দিন ও রাতের আবর্তন, পৃথিবীর ঘূর্ণন: আমরা দিনকে সরিয়ে নেই, এই শব্দচয়নটি অসাধারণ বৈজ্ঞানিক রূপক। এখানে “খোলস ছাড়ানো” বা “চামড়া তুলে নেওয়া” যেন রাত ও দিন পৃথিবীর চারপাশে পরপর আসা একটি বস্ত্রের মতো। আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যা অনুযায়ী, দিন–রাত্রির আবর্তন ঘটে পৃথিবীর নিজ অক্ষের উপর ঘূর্ণনের কারণে (rotation)। যখন পৃথিবীর একটি অংশ সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে, সেখানে দিন হয়; অপর পাশে রাত। কুরআনের এই আয়াত প্রকাশ করে রাত্রি ও দিনের এই ক্রমান্বয়িক, নিয়ন্ত্রিত এবং সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া।

(খ) সূর্যের চলন ও সৌরকক্ষপথ: সূর্য তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। বিজ্ঞান বলছে সূর্য স্থির নয়; বরং এটি তার সম্পূর্ণ সৌরজগতকে সঙ্গে নিয়ে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রের চারপাশে প্রায় ২২০ কিমি/সেকেন্ড বেগে ঘূর্ণায়মান। এই চলনের চূড়ান্ত গন্তব্য বা বলতে বোঝানো যেতে পারে, হয় সূর্যের অদূর ভবিষ্যৎ শারীরিক স্থিতি (যেমন ভবিষ্যৎ Death Phase বা Solar Collapse), নয়তো কিয়ামতের সময় পর্যন্ত তার নির্ধারিত জীবনচক্র। উভয় ব্যাখ্যাই কুরআনের শব্দের অন্তর্নিহিত বিস্তৃত অর্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

(গ) চন্দ্রের মঞ্জিল বা কক্ষপর্যায়: আমরা চন্দ্রের জন্য নির্দিষ্ট মঞ্জিল নির্ধারণ করেছি। বিজ্ঞান এখন জানে যে চাঁদ পৃথিবীকে কেন্দ্র করে এক মাসে একবার পরিক্রমণ করে, এবং তার প্রতিটি অবস্থান বা ফেজ (new moon, crescent, half, full moon ইত্যাদি) নির্দিষ্ট দূরত্ব ও সূর্যালোকের প্রতিফলনের কারণে ঘটে। কুরআনে বলা হয়েছে, শেষ পর্যায়ে চাঁদ হয় পুরোনো খেজুরের শাখার মতো বাঁকা ও পাতলা। এটি ঠিক সেই waning crescent অবস্থার চিত্র, যা চাঁদের শেষ ফেজে দেখা যায়।

(ঘ) মহাজাগতিক সাঁতার, গতিশীল সৃষ্টিজগৎ: “(প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে সাঁতার কাটছে)। এই আয়াতের “সাঁতার কাটছে” শব্দটি অত্যন্ত অর্থবহ, এটি গতিশীল তরঙ্গ বা তংল গতি (fluid motion) নির্দেশ করে, যেন সব গ্রহ-নক্ষত্র বিশাল মহাকাশের সাগরে ভেসে চলেছে। এটি এক অসাধারণ বৈজ্ঞানিক সত্যের পূর্বাভাস, পুরো মহাবিশ্বই গতিশীল, কিছুই স্থির নয়। সূর্য, চাঁদ, পৃথিবী সবাই ঘূর্ণন, পরিক্রমণ, এবং মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের এক অনন্ত গতির অংশ।

৩. দর্শন, ঈমান ও নৈতিক শিক্ষা:

(ক). নিয়মের সৌন্দর্য: মহাবিশ্বের প্রতিটি জিনিস নির্দিষ্ট আইন ও ভারসাম্যের অধীনে চলছে । এটি প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তিনি সৃষ্টিকর্তা সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান। মানবজীবনেও যদি এই নিয়ম ও ভারসাম্য হারিয়ে যায়, তবে বিশৃঙ্খলা অবশ্যম্ভাবী।

(খ). সময়ের শিক্ষা: দিন ও রাতের পরিবর্তন জীবনের সময়চক্রের প্রতীক, কখনো আলো, কখনো অন্ধকার, কিন্তু উভয়ই প্রয়োজনীয়। যেমন রাত্রি মানুষকে বিশ্রাম দেয়, তেমনি কঠিন সময়ও আত্মশুদ্ধির সুযোগ দেয়।

(গ). ঈমানের দৃষ্টি: যে ব্যক্তি আকাশের এই সুবিন্যস্ততা দেখে চিন্তা করে, তার হৃদয়ে আল্লাহর মহিমা প্রতিষ্ঠিত হয়। কুরআন বারবার আহ্বান করেছে, ” তারা কি আকাশের দিকে তাকায় না, কেমন করে তাকে উঠানো হয়েছে? জ্ঞানের মাধ্যমে ঈমানকে গভীর করা এখানেই উদ্দেশ্য।

৪. উপসংহার: সূরা ইয়াসীনের এই আয়াতসমূহ মহাবিশ্বের মহাজাগতিক নিয়ম ও কুরআনের বৈজ্ঞানিক প্রজ্ঞার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। চতুর্দশ শতাব্দী আগে যখন মানুষ সূর্য, চঁন্দ্র ও দিন-রাতের প্রকৃত কারণ জানত না, তখন কুরআন তা নিখুঁতভাবে ঘোষণা করেছিল। আজকের জ্যোতির্বিদ্যা সেই সত্যের সাক্ষ্য দিচ্ছে। অতএব, এ আয়াত শুধু বৈজ্ঞানিক বর্ণনা নয়, বরং এক গভীর আধ্যাত্মিক আহ্বান, যেন মানুষ আকাশ ও পৃথিবীর সুষম গতির ভেতর আল-কুদরাহ (আল্লাহর ক্ষমতা), আল-হিকমাহ (আল্লাহর প্রজ্ঞা) এবং আল-ইলম (আল্লাহর জ্ঞান) এর পরিচয় লাভ করে।

আধ্যাত্মিক প্রতিফলন ও দো‘আ: আল্লাহর কুদরতের নিদর্শনে ঈমানের জাগরণ: যখন আমরা রাতের আকাশের দিকে তাকাই, দেখি অসংখ্য তারা, সূর্য, চাঁদ, গ্রহ ও নক্ষত্র নিরবধি গতিতে চলছে, তখন বুঝি, এই মহাবিশ্ব কোন বিশৃঙ্খলতার সৃষ্টি নয়, বরং এক পরম প্রজ্ঞা ও পরিকল্পনার প্রতিফলন। দিন ও রাতের এই পরিবর্তন, সূর্যের নির্দিষ্ট পথে গমন, চাঁদের পর্যায়ক্রমিক রূপান্তর, সবই আমাদের শেখায়, জীবনও তেমনি এক সুনির্দিষ্ট চক্র, যেখানে প্রতিটি অবস্থা, প্রতিটি পরিবর্তনই আল্লাহর হিকমাহ (জ্ঞান ও উদ্দেশ্য) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। রাত্রি যেমন মানুষকে বিশ্রাম দেয়, তেমনি জীবনের অন্ধকার সময়ও আত্মশুদ্ধির সুযোগ দেয়। দিন যেমন কর্মের আহ্বান জানায়, তেমনি ঈমানদার জীবন হলো অবিরাম আলোর অনুসন্ধান।

এই নিদর্শনগুলো আমাদের শেখায়, আল্লাহই একমাত্র নিয়ন্তা, বিজ্ঞান তাঁর কুদরতের ভাষা, বিবেক ও বোধই ঈমানের জানালা। যে ব্যক্তি এসব নিয়ে চিন্তা করে, তার অন্তরে সৃষ্টি হয় গভীর ঈমান, নম্রতা, ও তাওহীদের বোধ। আর যে এসব নিদর্শন উপেক্ষা করে, সে যেন এমন এক যাত্রী—যে সূর্যের আলোয় চোখ বন্ধ রাখে।

দো‘আ: আল্লাহ-হুম্মা, হে পরম প্রজ্ঞাময় আল্লাহ, আমাদের অন্তর দৃষ্টি খুলে দাও যেন আমরা তোমার নিদর্শনগুলো দেখতে পারি আকাশে, পৃথিবীতে, নিজের অন্তরে। আমাদের হৃদয়ে এমন জ্ঞান দাও, যা শুধু তথ্য নয়, বরং ঈমানের আলো জ্বালায়। আমাদের জীবনে দিন–রাত্রির ভারসাম্যের মতোই শান্তি ও শৃঙ্খলা দাও। আমাদের কর্মে সূর্যের দৃঢ়তা, চিন্তায় চাঁদের কোমলতা, আর অন্তরে তাকওয়ার উজ্জ্বলতা দান করো।

হে রব্বুল আলামীন, তুমি আমাদেরকে এমন বানাও, যারা তোমার সৃষ্টিতে তোমার অস্তিত্ব চিনে নেয়, এবং এই চিন্তাকে ঈমান, আমল ও দাওয়াতে রূপান্তরিত করে। আমীন, ইয়া রব্বাল ‘আলামীন।

আল্লাহ-হুম্মা সাল্লী, ওয়া সাল্লিম, ওয়া বারিক আ’লা মুহাম্মাদ; আল-হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামীন। (মূসা: ২৫-১০-২৪)