জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন, ২০২৫-এর খসড়া নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন করেছে উপদেষ্টা পরিষদ। একই সাথে অনুমোদন করা হয়েছে দুদক অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ও জুলাই স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ। গতকাল বৃহস্পতিবারের প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের সভায় আরপিও সংশোধনের অনুমোদন দেয়া হয়। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সভায় সভাপতিত্ব করেন।
আরপিওর প্রধান পরিবর্তনগুলোর মধ্যে রয়েছে- পলাতক আসামি নির্বাচনে প্রার্থী অযোগ্য, প্রার্থীকে আদালত পলাতক ঘোষণা করেছেন, তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। ইভিএম বিধান বাতিল করে ইভিএম-সংক্রান্ত সব বিধান আরপিও থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। ‘না’ ভোট ফেরানো হয়েছে এবং একক প্রার্থীর আসনে ভোটাররা ‘না’ ভোট দিতে পারবেন। জামানত বৃদ্ধি করে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। ইসিকে পুরো আসনের ভোট বাতিলের মতা দেয়া হয়েছে। ফলে কেবল কেন্দ্র নয়, প্রয়োজন হলে পুরো নির্বাচনী আসনের ফল বাতিল করা যাবে। এ ছাড়া প্রার্থীর হলফনামায় সম্পদ ও আয়ের উৎস-প্রকটকরণ- দেশী-বিদেশী উপার্জনের উৎস ও সম্পত্তির বিবরণ অ্যাফিডেভিটে দিতে হবে; নির্বাচন কমিশন সেই তথ্য ওয়েবসাইটে প্রচার করতে পারবে।
আরপিওতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী আনা হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ইভিএম ব্যবহার বাতিল, ‘না ভোট’ পুনর্বহাল, প্রার্থীদের দেশী-বিদেশী আয় ও সম্পত্তির বিবরণ প্রকাশের বাধ্যবাধকতা এবং পলাতক আসামিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা। একই সাথে জোটের প্রার্থী হলেও নিজ দলের প্রতীকে নির্বাচন করতে হবে।
বৈঠকের পর রাজধানীর ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন- বাংলাদেশ শ্রম আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ২০২৫ চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়েছে। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় আইন, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর আইন নীতিগতভাবে অনুমোদন পেয়েছে। তিনি জানান, উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে জামিনবিষয়ে উচ্চ আদালতে কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিফ্রিংয়ে প্রেসসচিব শফিকুল আলমও উপস্থিত ছিলেন।
আইন উপদেষ্টা বলেন, আরপিওতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী হলো- ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) সংক্রান্ত বিধান বাতিল করা। পাশাপাশি ‘না ভোট’ পুনর্বহাল করা হয়েছে, যাতে কোনো নির্বাচনী আসনে কেবল একজন প্রার্থী থাকলে ভোটাররা তাকে ভোট না দেয়ার সুযোগ পান। ২০১৪ সালের ভুয়া নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতেই এই বিধান আনা হয়েছে। সেখানে ১৫৪ জন বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছিল। তাই সংশোধন করে একজন প্রার্থী থাকলে ভোটাররা যদি তাকে পছন্দ না করেন, ‘না ভোট’ দিতে পারবেন। তখন সেই আসনে আবার নির্বাচন হবে।
তিনি জানান, নতুন সংশোধনীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পলাতক আসামিরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। জেলাভিত্তিক নির্বাচন অফিসগুলোতে দায়িত্ব পালন করবেন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা। প্রার্থীদের দেশী ও বিদেশী উৎস থেকে আয় ও সম্পত্তির বিবরণ হলফনামায় দিতে হবে, যা নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে উন্মুক্তভাবে প্রকাশ করা হবে।
আইন উপদেষ্টা বলেন, প্রধান উপদেষ্টা নির্দেশ দিয়েছেন, নির্বাচনে অংশ নেয়া প্রত্যেক প্রার্থীর দেশী-বিদেশী আয় ও সম্পত্তির পূর্ণ বিবরণ নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। জনগণ যেন সহজেই জানতে পারেন তাদের প্রার্থীর আর্থিক অবস্থা কী।
সংশোধনীর মধ্যে আরো রয়েছে, নির্বাচনী জামানতের পরিমাণ ২০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলকে ৫০০ টাকার বেশি অনুদান বা চাঁদা দিতে হলে ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার বাধ্যতামূলক এবং অনুদানদাতার ট্যাক্স রিটার্ন জমা দিতে হবে। বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী ভোটার ও নির্বাচনী কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তারা ডাক ভোটে ভোট দিতে পারবেন। ভোট গণনার সময় গণমাধ্যমের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। কোনো নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপক অনিয়ম হলে পুরো এলাকার ভোট বাতিল করার মতা নির্বাচন কমিশনকে দেয়া হয়েছে।
আইন উপদেষ্টা জানান, জোটের প্রার্থীদের প্রতীক ব্যবহারে স্বচ্ছতা আনতে বিধান যোগ করা হয়েছে, যাতে ভোটাররা সহজেই বুঝতে পারেন কোন দল থেকে প্রার্থী হচ্ছেন।
‘না’ ভোটের বিধান: ‘না’ ভোটের একটা বিধান করা হয়েছে জানিয়ে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেছেন, যে আসনে একজন প্রার্থী থাকবে, সেখানে না ভোটের বিধান রাখা হয়েছে। ভোটাররা চাইলে একক প্রার্থীর বিপরীতে ‘নো’ ভোট দিতে পারবেন। তিনি আরো বলেন, জোটের েেত্র যদি নির্বাচনী জোট হয়, জোটের অংশ হলেও দলের যে প্রতীক সেটাতে ইলেকশন করতে হবে। যাতে ভোটাররা কিয়ার আইডিয়া পান যেকোনো দলের।
পোস্টাল ব্যালট : পোস্টাল ব্যালট প্রসঙ্গে আসিফ নজরুল বলেছেন, যারা ইলেকশন কাজে ব্যস্ত থাকেন, আমাদের আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনী, প্রিজাইডিং অফিসার বা অফিসার যারা নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত থাকেন, লাখ লাখ মানুষ নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত থাকেন, তাদের ভোট দিতে ভোট দেয়ার স্কোপ ছিল না। আমাদের বিধান করেছি যে, পোস্টাল ব্যালটে তারা ভোট দেবেন। আমাদের যারা প্রবাসী আছেন, তারা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেবেন। ইলেকশন কার্যক্রমে যারা নিয়োজিত থাকবেন, পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেবেন। ভোট কাউন্টিংয়ের জায়গাতে মিডিয়া থাকতে পারবে, সেটার বিধান করা হয়েছে।
৫০ হাজার টাকা চাঁদা ব্যাংকিং চ্যানেলে দিতে হবে: আইন উপদেষ্টা বলেন, যারা রাজনৈতিক দলকে টাকা পয়সা দেবেন, দান অনুদান বা চাঁদা যেভাবে হোক না কেন, ৫০ হাজার টাকা বা তার বেশি হলে এটা ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দিতে হবে। যিনি দেবেন তার ট্যাক্স রিটার্নটাও জমা দিতে হবে।
গণ্ডগোল হলে পুরো নির্বাচনী এলাকার নির্বাচন বাতিল: আইন উপদেষ্টা আরো বলেন, আগের আইনের বিধান ছিল যে কোনো একটা নির্বাচনী এলাকায় যদি কোনো ভোটকেন্দ্রে গণ্ডগোল হতো সে ভোটকেন্দ্রের ফলাফল বাতিল করার বিধান ছিল। এখন নির্বাচন কমিশন যদি মনে করে একটা নির্বাচনী এলাকাতেই এত বেশি অনিয়ম হয়েছে যে পুরো নির্বাচনী এলাকার ভোট বাতিল করা উচিত, তাহলে ইলেকশন কমিশন সেটা করতে পারবে। সেই মতা দেয়া হয়েছে।
উচ্চ আদালতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন: গতকালের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে কিছু বিষয়ে উচ্চ আদালতের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বলে জানিয়েছেন আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, সম্প্রতি উচ্চ আদালতের একটা বেঞ্চ একদিনে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টায় ৮০০ মামলায় প্রায় সবটাতে জামিন দিয়েছেন। জামিন উনি দিতেই পারেন কিন্তু চার-পাঁচ ঘণ্টায় ৮০০ মামলা কি শোনা সম্ভব? এটা কি আসলে বিচারিক বিবেচনা ছিল কি না এ রকম আরো কিছু কিছু প্রসঙ্গ উঠেছে। আমাদের মনে হয়, গোটা বিষয়গুলো বিবেচনা করে আমরা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আইনটা চূড়ান্ত করার পদপে নিতে পারব।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ: উপদেষ্টা বলেন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫ নিয়ে বোধ হয় আমরা ২৫-৩০ বছর যাবৎ কথা বলছি। ২০০৬ সালের দিকে খুব ভালোভাবে চেষ্টাও করা হয়েছিল আইনটা করার। কোনোভাবেই করা যাচ্ছিল না। কিন্তু আপনারা জানেন, আমাদের জাতীয় ঐকমত্য কমিশন আছে, বিচার বিভাগীয় সংস্কার কমিশন আছে, সংস্কারের রোডম্যাপ আছে, সব জায়গায় সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। আমরা এই আইনটা নীতিগতভাবে অনুমোদন করেছি।
আসিফ নজরুল বলেন, এই আইনটা যখন চূড়ান্ত অনুমোদন হয়ে যাবে, তখন আদালতের যারা বিচারক আছেন, তাদের বদলি-পদায়ন-পদোন্নতি, তাদের শৃঙ্খলা সংক্রান্ত সব ব্যাপার, সবকিছু সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। আর সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব বাজেট ব্যবস্থাপনা থাকবে। তাদের সম্পত্তি, তাদের কী কী খাতে তারা উন্নয়ন করবে, কী কী পদ সৃজন করবেন এসব ব্যাপারে তাদের একটা আর্থিক স্বাধীনতা থাকবে। এটা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের মনে হয়েছে কিছু কিছু বিষয়ে আরো আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে যেহেতু এটার সাথে আর্থিক সংশ্লেষ রয়েছে। অবশ্যই অর্থ উপদেষ্টার একটা মতামতের প্রয়োজন রয়েছে। আইনটা করার সময় সেই মতামতটা নেয়া হয় নাই। জনপ্রশাসনের সাথে আলোচনা করার প্রয়োজন রয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ অনুমোদন: আইন উপদেষ্টা বলেন, আমরা নীতিগতভাবে অনুমোদন করেছি জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ। গণভবনের জায়গায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে আমাদের যেই তরুণরা প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের চিরস্থায়ী অঙ্গহানি হয়েছে, আমাদের যে অপূরণীয় আত্মত্যাগের ঘটনা আছে, আর ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারকে পতনের একটা স্মারক হিসেবে স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য আমরা গণভবনে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর করছি। এটা আমরা একটা আলাদা জাদুঘর হিসেবে স্থাপন করতে চাই। সেখানে লোকবল লাগবে, আর্থিক সংশ্লিষ্টতা আছে, সেজন্য আরো একটু আলাপ-আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। এটাও আমরা খুব দ্রুত চেষ্টা করব। খুব দ্রুত এটা চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করার জন্য মোটামুটি আইনগত ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে।
দুদক অধ্যাদেশ অনুমোদন : তিনি বলেন, আরেকটা আইন যা নীতিগতভাবে অনুমোদন হয়েছে, সেটা হচ্ছে দুদক অধ্যাদেশ (দুদক অর্ডিন্যান্স)। সেখানে কিছু কিছু বিধান করা হয়েছে। বাংলাদেশে যারা থাকবে- বাংলাদেশী হোক বা বিদেশী হোক, বাংলাদেশে অবস্থানকালে অন্য দেশে যদি কোনো দুর্নীতি করে, সেটার বিচারও দুদকের মাধ্যমে, সেটার তদন্তও দুদকের মাধ্যমে করা যাবে। আর ওখানে জ্ঞাত আয়ের সংজ্ঞাতে বলা হচ্ছে, জ্ঞাত আয় মানে বৈধ আয়। জ্ঞাত আয় মানে অবৈধ আয় নয়। এগুলো স্পষ্ট করা হয়েছে। বাংলাদেশের যে জায়গায় দুদকের অফিস থাকবে, সেখানেই দুদকের স্পেশাল কোর্ট গঠন করার বিধান করা হয়েছে। দুদকের যারা চেয়ারম্যান থাকবেন বা দুদকের যিনি প্রধান থাকবেন, তাদের বাছাই করার জন্য সাত সদস্যের বাছাই কমিটি করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারকের নেতৃত্বে তা হবে। এবং তারা গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রার্থী বাছাই করবে। তা ছাড়া তারা নিজেরাও প্রার্থী বাছাই করবে। কমিশনের যে কার্যাবলি দুদকের, সেটার কার্যাবলি বাড়ানো হয়েছে। মতা বাড়ানো হয়েছে। এজাহার দায়ের, তদন্ত, অনুসন্ধানের মতা বাড়ানো হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, দুদকের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতার প্রয়োজন রয়েছে। দুদকের কাজ দুর্নীতি দমন করা। কিন্তু দুদকের অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এইটা আমরা খুব গুরুত্ব সহকারে নিয়েছি এবং বলেছি যে, আজকে আমরা এটা নীতিগতভাবে অনুমোদন করলাম। আইনটা চূড়ান্ত করার আগে দুদকের যে অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতার পদ্ধতি, সেটাকে আরো অনেক শক্তিশালী করতে হবে। এগুলোর বাইরে আরো কিছু বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।





















