ঢাকা ০৫:৫০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
সিটি কলেজে নতুন কমিটিকে প্রত্যাখ্যান: অবাঞ্ছিত ঘোষণা রাজশাহী কলেজে ব্রাজিল সমর্থকদের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা অত্যন্ত সুকৌশলে ১১ দলীয় জোটকে ক্ষমতার বাইরে রাখা হয়েছে : অলি আহমদ বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে সুইডেনের রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ কওমি মাদরাসার বাজেট ইস্যু-বিএনপি কোনো কওমের জন্য কাজ করে না : নিলোফার চৌধুরী মনি বগুড়ায় শিশু রিফাত হত্যার ঘটনায় ৫ জনের ফাঁসি, ৫ জনের কারাদণ্ড বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে রাজশাহী কলেজে আলোচনা সভা ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে জামায়াত: সেলিম উদ্দিন মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় দুবাই ভিসা, ৪ হাজারে মিলছে থাকার হোটেল মামুনুল হককে নিয়ে আলোচনা: নিজের বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করলেন স্পিকার

ফসল উৎপাদনে জৈবপ্রযুক্তি ও ইসলামী শরীয়াহর দৃষ্টিভঙ্গি: ফতোয়া, যুক্তি ও সীমারেখা

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১১:২৮:২৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ৬৯ বার পড়া হয়েছে

প্রসঙ্গ সম্পাদকীয়: আমার সুহৃদয় বন্ধু প্রফেসর ড. আলীমুজ্জামান চমৎকার ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন: “ফসল উৎপাদনে জৈব প্রযুক্তি (Biotechnology, যেমন জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, হাইব্রিড, টিস্যু কালচার ইত্যাদি) ব্যাবহারে ইসলামী শরীয়ায় কোন নিষেধ নেই বলে মত প্রকাশ করেছেন আলেমগন। তাঁরা বলছেন, শরীয়াহ এটা অনুমোদন করে। কিন্তু, কোরআনের কোন আয়াতের প্রেক্ষাপটে এই অনুমোদন? এটা “সৃষ্টির গতানুগতিক নিয়ম বদলানো”র প্রচেষ্টা নয় কি”?

ভূমিকা: আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে জৈবপ্রযুক্তি (Biotechnology), যেমন জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং (Genetic engineering) , হাইব্রিড জাত উন্নয়ন (Hybridization), টিস্যু কালচার (Tissue culture) ইত্যাদি কৃষি উৎপাদনে বিপ্লব ঘটিয়েছে। এর ফলে একদিকে খাদ্য ঘাটতি নিরসন, পুষ্টি উন্নয়ন ও রোগ-প্রতিরোধী ফসল উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে এটি নিয়ে নৈতিক ও ধর্মীয় প্রশ্নও উঠেছে।

বিশেষ করে ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী এই প্রযুক্তি বৈধ, নাকি “আল্লাহর সৃষ্টিকে পরিবর্তন” হিসেবে নিষিদ্ধ, এ নিয়ে আলোচনা বহু বছর ধরেই চলে আসছে এবং এই আলোচনার প্রয়োজনও আছে।

এ প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন ইসলামি ফিকহি পরিষদ, আলেমসমাজ ও গবেষকরা মতামত প্রদান করেছেন। তাঁরা কুরআন ও হাদীসের আলোকে ফসল উন্নয়নে জৈবপ্রযুক্তির ব্যবহারকে নির্দিষ্ট কিছু শর্তসাপেক্ষে অনুমোদনযোগ্য বলে অভিহিত করেছেন।

এই প্রবন্ধে আমরা কুরআন ও হাদীসের প্রাসঙ্গিক দিক, আলেমদের কিয়াস, আন্তর্জাতিক ফতোয়া ও সম্মেলনের সিদ্ধান্তসমূহ আলোচনা করব, যেন এ বিষয়ে একটি পরিষ্কার ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়া যায়।

১. শরীয়াহ্-সম্মত অনুমোদনের যুক্তি: কুরআন ও হাদীসের দিকনির্দেশনা: (ক) আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত ব্যবহার: “তিনিই তোমাদের জন্য পৃথিবীর সবকিছু সৃষ্টি করেছেন”। (সূরা আল-বাকারাহ, ২:২৯)! এখানে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, পৃথিবীর সবকিছু মানুষের কল্যাণের জন্য। সুতরাং মানুষ যদি আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে গবেষণা, প্রযুক্তি বা উন্নতির জন্য ব্যবহার করে, তা বৈধ, যতক্ষণ তা হারাম কোনো কাজে ব্যবহার না হয়।

(খ) প্রকৃতির নিয়মকে কাজে লাগানো: “তুমি কি দেখ না, আল্লাহ আকাশ হতে পানি বর্ষণ করেন, আর আমরা তার দ্বারা বিভিন্ন রঙের ফল-ফসল উৎপন্ন করি…” (সূরা ফাতির, ৩৫:২৭)

আল্লাহ নিজেই ফল-ফসল উৎপাদনের বৈচিত্র্যের কথা উল্লেখ করেছেন। এ বৈচিত্র্যকে কাজে লাগিয়ে হাইব্রিড, টিসু কালচার (Tissue culture), জেনেটিক উন্নয়ন করা মূলত “আল্লাহর সৃষ্ট বৈচিত্র্য” ব্যবহার করা, সৃষ্টি পরিবর্তন নয়।

(গ) চিকিৎসা ও উন্নতিতে অনুমোদন: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: “আল্লাহ রোগ সৃষ্টি করেছেন, আর তিনি তার প্রতিকারও সৃষ্টি করেছেন”। (সহিহ বুখারি-৫৬৭৮, মুসলিম-২২০৪)।

কৃষি উৎপাদনের ঘাটতি বা রোগপোকা প্রতিরোধও একধরনের “রোগ প্রতিকার”। যেমন ভ্যাকসিন শরীরে ব্যবহার করা যায়, তেমনি গাছের উৎপাদন বাড়াতে জেনেটিক টেকনিক ব্যবহার শরীয়াহ অনুযায়ী জায়েজ।

(ঘ). ক্ষতি না করা: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: “কোনো ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির প্রতিশোধও নেওয়া যাবে না”। (ইবনে মাজাহ-২৩৪০)! জেনেটিক প্রযুক্তি মানুষের খাদ্য, স্বাস্থ্য বা পরিবেশে ক্ষতি করলে তা শরীয়াহ অনুযায়ী নিষিদ্ধ হবে।

২. “সৃষ্টি পরিবর্তন” প্রসঙ্গ: উত্থাপিত প্রশ্ন: এটা কি “সৃষ্টি পরিবর্তন” নয়?: কুরআনে শায়তানের উক্তি: “আমি তাদেরকে অবশ্যই নির্দেশ দিব আর তারা আল্লাহর সৃষ্টি বিকৃত করবেই…”। (সূরা আন-নিসা, ৪:১১৯)! এই আয়াতে শয়তানের উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়েছে যে শায়তান, “আল্লাহর সৃষ্টিকে পরিবর্তন করবে”।

কিন্তু আলেমগণ ব্যাখ্যা করেন: এখানে অর্থ হলো ধর্মীয় ও প্রাকৃতিক ফিতরাহ বদলে দেয়া, যেমন পুরুষ-নারীর লিঙ্গ পরিবর্তন, হারামকে হালাল বানানো, বা আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা অমান্য করা।

কিন্তু ফসল উন্নয়ন, গবাদিপশুর বংশগতি উন্নয়ন, কিংবা নতুন ওষুধ আবিষ্কার, এসবকে “সৃষ্টি ধ্বংস” বলা হয় না, বরং “সৃষ্টি ব্যবহার” বলা হয়।

কিয়াস (Analogy): যেমন চাষি বীজ বাছাই করে, গ্রাফটিং (Grafting) করে, কৃত্রিম সেচ ব্যবহার করে, এসব কি আল্লাহর সৃষ্টির বিরুদ্ধে? না। এগুলো আল্লাহর দেওয়া জ্ঞানের কল্যাণকর ব্যবহার। অকল্যাণকর এবং হারাম কাজে আল্লাহর দেওয়া জ্ঞানের ব্যবহারে অনুমতি নেই।

৩. ফিকহি নীতিমাল: (ক). কোনো কিছুর মূলনীতি হলো, নিষেধাজ্ঞা প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত তা বৈধ। (খ). মানুষের জন্য ক্ষতিকর না হয়। “ক্ষতি করো না, ক্ষতি ভোগ করো না”। (গ). হারাম উপাদান ব্যবহার করা যাবে না। (ঘ). প্রতারণা বা জালিয়াতি করা যাবে না (যেমন ক্ষতিকর জিএমও লুকিয়ে বিক্রি করা যাবে না)। (ঙ). পরিবেশের জন্য ধ্বংসাত্মক না হয়। (চ). সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে নতুন পদ্ধতি গ্রহণ বৈধ। (ছ). যদি কোনো বৈধ কাজ ভবিষ্যতে ক্ষতিকর পরিণতির দিকে নিয়ে যায়, তবে তা রোধ করতে হবে।

৪. আধুনিক ফতোয়া ও সম্মেলনের সিদ্ধান্ত:(ক). GM ফসল বৈধ, যতক্ষণ ক্ষতির প্রমাণ না হয়। (খ). GM Crops হালাল, যদি উৎস হালাল হয়; খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এটিকে ‘ফরজে কিফাইয়া’ বলা হয়েছে। (গ). ক্ষতি করলে নিষিদ্ধ; হালাল উৎস হলে বৈধ। (ঘ). কৃষি, চিকিৎসা ও পশুপালনে জেনেটিক প্রযুক্তি বৈধ; কিন্তু ক্ষতি হলে নিষিদ্ধ। (ঙ). GM Foods হালাল, যদি কোনোরূপ হারাম DNA না থাকে। আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামিক ফিকহ একাডেমি (OIC) এর গবেষকরা উপরোক্ত সিদ্ধান্ত সমর্থন করেছেন।

৫. উপসংহার: কুরআন ও হাদীস মানুষের কল্যাণে প্রকৃতিকে কাজে লাগানোর অনুমতি দিয়েছে। হারাম এবং অকল্যাণমূলক কোন কাজে প্রকৃতিকে ব্যবহার অবৈধ।

ফসল উৎপাদনে জৈবপ্রযুক্তি ব্যবহারকে কুরআন-হাদীস সরাসরি নিষিদ্ধ করেনি। বরং আল্লাহর নিয়ামত ব্যবহার, বৈচিত্র্যের সদ্ব্যবহার ও কল্যাণকর গবেষণা শরীয়াহ অনুযায়ী বৈধ।

তবে শর্ত হলো: হারাম উপাদান ব্যবহার না হওয়া, মানুষ ও পরিবেশের ক্ষতি না হওয়া, এবং প্রতারণা বা জালিয়াতি না হওয়া।

“সৃষ্টি পরিবর্তন” মানে ফিতরাহ বদলানো বা আল্লাহর সীমা ভেঙে ফেলা, ফসল উন্নয়ন তার মধ্যে পড়ে না। অতএব, Biotechnology শরীয়াহর দৃষ্টিতে মুবাহ (অনুমোদিত) এবং মানবকল্যাণে সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি ইসলামের মূলনীতি, “কল্যাণ করা ও ক্ষতি দূর করা” এর সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।

আল্লাহ-হুম্মা সাল্লি, ওয়া সাল্লিম, ওয়া বারিক আ’লা মুহাম্মাদ; আল-হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামীন। (মূসা: ০১-০৯-২৫)

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

ফসল উৎপাদনে জৈবপ্রযুক্তি ও ইসলামী শরীয়াহর দৃষ্টিভঙ্গি: ফতোয়া, যুক্তি ও সীমারেখা

আপডেট সময় : ১১:২৮:২৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৫

প্রসঙ্গ সম্পাদকীয়: আমার সুহৃদয় বন্ধু প্রফেসর ড. আলীমুজ্জামান চমৎকার ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন: “ফসল উৎপাদনে জৈব প্রযুক্তি (Biotechnology, যেমন জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, হাইব্রিড, টিস্যু কালচার ইত্যাদি) ব্যাবহারে ইসলামী শরীয়ায় কোন নিষেধ নেই বলে মত প্রকাশ করেছেন আলেমগন। তাঁরা বলছেন, শরীয়াহ এটা অনুমোদন করে। কিন্তু, কোরআনের কোন আয়াতের প্রেক্ষাপটে এই অনুমোদন? এটা “সৃষ্টির গতানুগতিক নিয়ম বদলানো”র প্রচেষ্টা নয় কি”?

ভূমিকা: আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে জৈবপ্রযুক্তি (Biotechnology), যেমন জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং (Genetic engineering) , হাইব্রিড জাত উন্নয়ন (Hybridization), টিস্যু কালচার (Tissue culture) ইত্যাদি কৃষি উৎপাদনে বিপ্লব ঘটিয়েছে। এর ফলে একদিকে খাদ্য ঘাটতি নিরসন, পুষ্টি উন্নয়ন ও রোগ-প্রতিরোধী ফসল উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে এটি নিয়ে নৈতিক ও ধর্মীয় প্রশ্নও উঠেছে।

বিশেষ করে ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী এই প্রযুক্তি বৈধ, নাকি “আল্লাহর সৃষ্টিকে পরিবর্তন” হিসেবে নিষিদ্ধ, এ নিয়ে আলোচনা বহু বছর ধরেই চলে আসছে এবং এই আলোচনার প্রয়োজনও আছে।

এ প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন ইসলামি ফিকহি পরিষদ, আলেমসমাজ ও গবেষকরা মতামত প্রদান করেছেন। তাঁরা কুরআন ও হাদীসের আলোকে ফসল উন্নয়নে জৈবপ্রযুক্তির ব্যবহারকে নির্দিষ্ট কিছু শর্তসাপেক্ষে অনুমোদনযোগ্য বলে অভিহিত করেছেন।

এই প্রবন্ধে আমরা কুরআন ও হাদীসের প্রাসঙ্গিক দিক, আলেমদের কিয়াস, আন্তর্জাতিক ফতোয়া ও সম্মেলনের সিদ্ধান্তসমূহ আলোচনা করব, যেন এ বিষয়ে একটি পরিষ্কার ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়া যায়।

১. শরীয়াহ্-সম্মত অনুমোদনের যুক্তি: কুরআন ও হাদীসের দিকনির্দেশনা: (ক) আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত ব্যবহার: “তিনিই তোমাদের জন্য পৃথিবীর সবকিছু সৃষ্টি করেছেন”। (সূরা আল-বাকারাহ, ২:২৯)! এখানে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, পৃথিবীর সবকিছু মানুষের কল্যাণের জন্য। সুতরাং মানুষ যদি আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে গবেষণা, প্রযুক্তি বা উন্নতির জন্য ব্যবহার করে, তা বৈধ, যতক্ষণ তা হারাম কোনো কাজে ব্যবহার না হয়।

(খ) প্রকৃতির নিয়মকে কাজে লাগানো: “তুমি কি দেখ না, আল্লাহ আকাশ হতে পানি বর্ষণ করেন, আর আমরা তার দ্বারা বিভিন্ন রঙের ফল-ফসল উৎপন্ন করি…” (সূরা ফাতির, ৩৫:২৭)

আল্লাহ নিজেই ফল-ফসল উৎপাদনের বৈচিত্র্যের কথা উল্লেখ করেছেন। এ বৈচিত্র্যকে কাজে লাগিয়ে হাইব্রিড, টিসু কালচার (Tissue culture), জেনেটিক উন্নয়ন করা মূলত “আল্লাহর সৃষ্ট বৈচিত্র্য” ব্যবহার করা, সৃষ্টি পরিবর্তন নয়।

(গ) চিকিৎসা ও উন্নতিতে অনুমোদন: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: “আল্লাহ রোগ সৃষ্টি করেছেন, আর তিনি তার প্রতিকারও সৃষ্টি করেছেন”। (সহিহ বুখারি-৫৬৭৮, মুসলিম-২২০৪)।

কৃষি উৎপাদনের ঘাটতি বা রোগপোকা প্রতিরোধও একধরনের “রোগ প্রতিকার”। যেমন ভ্যাকসিন শরীরে ব্যবহার করা যায়, তেমনি গাছের উৎপাদন বাড়াতে জেনেটিক টেকনিক ব্যবহার শরীয়াহ অনুযায়ী জায়েজ।

(ঘ). ক্ষতি না করা: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: “কোনো ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির প্রতিশোধও নেওয়া যাবে না”। (ইবনে মাজাহ-২৩৪০)! জেনেটিক প্রযুক্তি মানুষের খাদ্য, স্বাস্থ্য বা পরিবেশে ক্ষতি করলে তা শরীয়াহ অনুযায়ী নিষিদ্ধ হবে।

২. “সৃষ্টি পরিবর্তন” প্রসঙ্গ: উত্থাপিত প্রশ্ন: এটা কি “সৃষ্টি পরিবর্তন” নয়?: কুরআনে শায়তানের উক্তি: “আমি তাদেরকে অবশ্যই নির্দেশ দিব আর তারা আল্লাহর সৃষ্টি বিকৃত করবেই…”। (সূরা আন-নিসা, ৪:১১৯)! এই আয়াতে শয়তানের উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়েছে যে শায়তান, “আল্লাহর সৃষ্টিকে পরিবর্তন করবে”।

কিন্তু আলেমগণ ব্যাখ্যা করেন: এখানে অর্থ হলো ধর্মীয় ও প্রাকৃতিক ফিতরাহ বদলে দেয়া, যেমন পুরুষ-নারীর লিঙ্গ পরিবর্তন, হারামকে হালাল বানানো, বা আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা অমান্য করা।

কিন্তু ফসল উন্নয়ন, গবাদিপশুর বংশগতি উন্নয়ন, কিংবা নতুন ওষুধ আবিষ্কার, এসবকে “সৃষ্টি ধ্বংস” বলা হয় না, বরং “সৃষ্টি ব্যবহার” বলা হয়।

কিয়াস (Analogy): যেমন চাষি বীজ বাছাই করে, গ্রাফটিং (Grafting) করে, কৃত্রিম সেচ ব্যবহার করে, এসব কি আল্লাহর সৃষ্টির বিরুদ্ধে? না। এগুলো আল্লাহর দেওয়া জ্ঞানের কল্যাণকর ব্যবহার। অকল্যাণকর এবং হারাম কাজে আল্লাহর দেওয়া জ্ঞানের ব্যবহারে অনুমতি নেই।

৩. ফিকহি নীতিমাল: (ক). কোনো কিছুর মূলনীতি হলো, নিষেধাজ্ঞা প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত তা বৈধ। (খ). মানুষের জন্য ক্ষতিকর না হয়। “ক্ষতি করো না, ক্ষতি ভোগ করো না”। (গ). হারাম উপাদান ব্যবহার করা যাবে না। (ঘ). প্রতারণা বা জালিয়াতি করা যাবে না (যেমন ক্ষতিকর জিএমও লুকিয়ে বিক্রি করা যাবে না)। (ঙ). পরিবেশের জন্য ধ্বংসাত্মক না হয়। (চ). সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে নতুন পদ্ধতি গ্রহণ বৈধ। (ছ). যদি কোনো বৈধ কাজ ভবিষ্যতে ক্ষতিকর পরিণতির দিকে নিয়ে যায়, তবে তা রোধ করতে হবে।

৪. আধুনিক ফতোয়া ও সম্মেলনের সিদ্ধান্ত:(ক). GM ফসল বৈধ, যতক্ষণ ক্ষতির প্রমাণ না হয়। (খ). GM Crops হালাল, যদি উৎস হালাল হয়; খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এটিকে ‘ফরজে কিফাইয়া’ বলা হয়েছে। (গ). ক্ষতি করলে নিষিদ্ধ; হালাল উৎস হলে বৈধ। (ঘ). কৃষি, চিকিৎসা ও পশুপালনে জেনেটিক প্রযুক্তি বৈধ; কিন্তু ক্ষতি হলে নিষিদ্ধ। (ঙ). GM Foods হালাল, যদি কোনোরূপ হারাম DNA না থাকে। আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামিক ফিকহ একাডেমি (OIC) এর গবেষকরা উপরোক্ত সিদ্ধান্ত সমর্থন করেছেন।

৫. উপসংহার: কুরআন ও হাদীস মানুষের কল্যাণে প্রকৃতিকে কাজে লাগানোর অনুমতি দিয়েছে। হারাম এবং অকল্যাণমূলক কোন কাজে প্রকৃতিকে ব্যবহার অবৈধ।

ফসল উৎপাদনে জৈবপ্রযুক্তি ব্যবহারকে কুরআন-হাদীস সরাসরি নিষিদ্ধ করেনি। বরং আল্লাহর নিয়ামত ব্যবহার, বৈচিত্র্যের সদ্ব্যবহার ও কল্যাণকর গবেষণা শরীয়াহ অনুযায়ী বৈধ।

তবে শর্ত হলো: হারাম উপাদান ব্যবহার না হওয়া, মানুষ ও পরিবেশের ক্ষতি না হওয়া, এবং প্রতারণা বা জালিয়াতি না হওয়া।

“সৃষ্টি পরিবর্তন” মানে ফিতরাহ বদলানো বা আল্লাহর সীমা ভেঙে ফেলা, ফসল উন্নয়ন তার মধ্যে পড়ে না। অতএব, Biotechnology শরীয়াহর দৃষ্টিতে মুবাহ (অনুমোদিত) এবং মানবকল্যাণে সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি ইসলামের মূলনীতি, “কল্যাণ করা ও ক্ষতি দূর করা” এর সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।

আল্লাহ-হুম্মা সাল্লি, ওয়া সাল্লিম, ওয়া বারিক আ’লা মুহাম্মাদ; আল-হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামীন। (মূসা: ০১-০৯-২৫)