ঢাকা ০৮:৩৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
সিটি কলেজে নতুন কমিটিকে প্রত্যাখ্যান: অবাঞ্ছিত ঘোষণা রাজশাহী কলেজে ব্রাজিল সমর্থকদের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা অত্যন্ত সুকৌশলে ১১ দলীয় জোটকে ক্ষমতার বাইরে রাখা হয়েছে : অলি আহমদ বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে সুইডেনের রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ কওমি মাদরাসার বাজেট ইস্যু-বিএনপি কোনো কওমের জন্য কাজ করে না : নিলোফার চৌধুরী মনি বগুড়ায় শিশু রিফাত হত্যার ঘটনায় ৫ জনের ফাঁসি, ৫ জনের কারাদণ্ড বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে রাজশাহী কলেজে আলোচনা সভা ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে জামায়াত: সেলিম উদ্দিন মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় দুবাই ভিসা, ৪ হাজারে মিলছে থাকার হোটেল মামুনুল হককে নিয়ে আলোচনা: নিজের বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করলেন স্পিকার

“ওহী গায়র মাতলু” অস্বীকারকারীদের অবস্থান: আইন, নীতি ও দর্শনের আলোকে বিশ্লেষণ

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১১:০৯:২৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২০ অক্টোবর ২০২৫ ৫৫ বার পড়া হয়েছে

ড. গোলাম মোস্তফা মূসা: একজন কুরআনিষ্ট (আহলে কুরআন) ভাই প্রশ্ন করেছেন: কুরআন হলো আল্লাহর “আহসানুল হাদীস” অর্থাৎ উত্তম হাদীস (৩৯:২৩)। কুরআন নামক এই উত্তম হাদীস থাকতে কেন আমাদেরকে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর হাদীস ও সুন্নাহ মানতে হবে?

প্রাকটিক্যাল অ্যাপলিকেশন: দ্বিতীয় প্রকার ওহী (ওহী গায়র মাতলু), অর্থাৎ হাদীস ও সুন্নাহ অস্বীকারকারী গোষ্ঠী (কুরআনিষ্ট বা আহলে কুরআন), তাদের চিন্তা, বিশ্বাস ও অবস্থানের উপর আইন, নীতি, নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও দর্শনের আলোকে একটি বিশ্লেষণ:

১. মূল দর্শন: ‘ওহী গায়র মাতলু’ মানে আল্লাহর ব্যাখ্যামূলক নির্দেশ

কুরআন নিজেই ঘোষণা করে যে, নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) কেবল কুরআন পাঠ করেই থেমে যাননি; তিনি তা ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ ও বাস্তব শিক্ষা দিয়েছেন। “আমি তোমার প্রতি এই যিকির (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি, যাতে তুমি মানুষকে ব্যাখ্যা করে দাও যা তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে।” (সূরা আন-নাহল ১৬:৪৪)!

নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) কুরআনের এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেছেন আল্লাহর নিকট থেকে; আল্লাহ বলেন, “অতঃপর আমাদের দায়িত্ব হলো (এই কুরআন) বর্ণনা ও ব্যখ্যা করে দেওয়া (সূরা ক্বিয়ামাহ, ৭৫:১৯)!

অর্থাৎ, ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের নির্দেশও ওহীর অংশ। অতএব, যারা শুধু প্রথম প্রকার ওহী (কুরআন) গ্রহণ করে কিন্তু দ্বিতীয় প্রকার ওহী (হাদীস-সুন্নাহ) অস্বীকার করে, তারা প্রকৃতপক্ষে কুরআনেরই একটি মৌলিক নির্দেশ অস্বীকার করছে।

২. আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ:

(ক) ইসলামী শরীয়ত কেবল কুরআনভিত্তিক নয়; বরং কুরআন ও সুন্নাহ উভয়ই আইন প্রণয়নের উৎস।

“তোমরা যদি কোনো বিষয়ে মতবিরোধে পড়ো, তবে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরে যাও।” (সূরা আন-নিসা ৪:৫৯)!

এখানে মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে ‘কুরআন’ এবং রাসূলের পক্ষ থেকে তাঁর ‘সুন্নাহ ও হাদীস’কে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। অতএব, আইনগতভাবে সুন্নাহ-হাদীস অস্বীকার করা মানে শরীয়তের একটি উৎস অস্বীকার করা, যা ইসলামী আইনভিত্তিক রাষ্ট্রে আকীদাগত অপরাধ (ইলহাদ বা বিদ’আদ) হিসেবে গণ্য।

(খ) ইসলামী ফিকহ ও শরিয়াহ-নীতির দৃষ্টিতে “ওহী গায়র মাতলু” ছাড়া সালাত, সিয়াম, যাকাত, হজ্জ, মিরাস, বিবাহ, তালাক, ওয়ারিশ ইত্যাদি বিষয়ের সুনির্দিষ্ট বিধান নির্ধারণই সম্ভব নয়। অতএব, কুরআনিস্টরা কার্যত শরিয়াহের বিধানহীন সমাজের দাবিদার, যা একটি আইনশূন্যতা ও নৈতিক বিশৃঙ্খলার দৃষ্টান্ত।

৩. নীতিশাস্ত্র ও নৈতিকতার আলোকে বিশ্লেষণ:

(ক) যারা দাবি করে: “কুরআনই যথেষ্ট।” কিন্তু নৈতিকভাবে, তারা আল্লাহর প্রেরিত রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর শিক্ষাকে অগ্রাহ্য করছে, যা এক ধরনের অবাধ্যতা (Insubordination)। আল্লাহ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি আনুগত্য কুরআনেই বাধ্যতামূলক করেছেন: “যে রাসূলের আনুগত্য করে, সে আল্লাহরই আনুগত্য করে।” (সূরা আন-নিসা ৪:৮০)!

(খ) তাই নৈতিক দিক থেকে হাদীস ও সুন্নাহ অস্বীকার করা মানে নবীর কর্তৃত্বকে অস্বীকার করা, আর তা আল্লাহর কর্তৃত্বকেই চ্যালেঞ্জ করা।
এটি এমন যেন কেউ বলে, “সংবিধান আমি মানি, কিন্তু আদালতের ব্যাখ্যা মানি না।”
একইভাবে, কুরআনিস্টরা কুরআন মানলেও তার ব্যাখ্যা ও বাস্তব প্রয়োগকে প্রত্যাখ্যান করে নিজেদেরই যুক্তিবাদে ফাঁদে পড়ে।

৪. মূল্যবোধের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ:

(ক) ইসলামিক মূল্যবোধের অন্যতম মূল স্তম্ভ হলো তাওহীদ, রিসালাত, আখিরাত; এই তিন স্তম্ভ ছাড়া ইসলাম অসম্পূর্ণ।
রিসালাত মানে নবুয়তের উপর বিশ্বাস এবং নবীর কথাবার্তা, কাজ ও কর্মপন্থা (সুন্নাহ-হাদীস) মানা সেই বিশ্বাসেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ।

(খ) ইসলামী বর্হিভূত কিছু ভ্রান্ত মতবাদ সমাজে ধর্মীয় বৈচিত্র্যের ছদ্মবেশে নৈতিক শূন্যতা তৈরি করছে। কারণ, যখন মানুষ নিজেই নিজের যুক্তি অনুযায়ী কুরআনের ব্যাখ্যা করবে, রিসালাতকে অস্বীকার করবে, তখন নৈতিক মানদণ্ড হবে “যে যার মতো কুরআন বোঝ”, ফলে ফলাফল হবে অরাজকতা, বিভাজন ও মূল্যবোধের পতন।

৫. দর্শনের আলোকে বিশ্লেষণ:

(ক) দার্শনিকভাবে ওহী (কুরআন) মানে “আল্লাহর জ্ঞান যা মানুষের জ্ঞানের বাইরে।” অতএব, ওহীর (কুরআনের) ব্যাখ্যা তথা সুন্নাহ-হাদীস মানবচিন্তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করে; এটি একটি “দিব্য জ্ঞানতত্ত্ব Epistemology”; আল্লাহর জ্ঞানের দর্শন।

(খ) যারা সুন্নাহ-হাদীস অস্বীকার করে, তারা মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত “ওহীর দর্শন”কে মানববুদ্ধিতে সীমাবদ্ধ করে। এটি Rational Reductionism, অর্থাৎ আল্লাহ প্রদত্ত সত্যকে যুক্তি ও ভুল ব্যাখ্যায় বন্দি করা। ফলে তারা “আল-হক” (সত্য) থেকে দূরে সরে গিয়ে “আল-জান্নাতুল মাউহূমাহ” (কল্পিত জান্নাত বা মায়াবী সুখের স্বর্গ)-এর জগতে প্রবেশ করে।

৬. বাস্তব ও সামাজিক প্রয়োগ (Real-world implication):

(ক) যদি হাদীসকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র কুরআন দ্বারা সমাজ পরিচালনা করা হয়, তাহলে: সালাত কেমন হবে কেউ জানবে না। যাকাতের পরিমাণ নির্ধারণ অসম্ভব হবে। হজ্জ, বিয়ে, তালাক, উত্তরাধিকার সবই ব্যাখ্যাহীন হয়ে পড়বে।

(খ) বাস্তব সমাজে এমন চিন্তা ধর্মনিরপেক্ষতার চেয়েও বিপজ্জনক, কারণ এটি “আল্লাহর বাণীকে নিজের মতো করে সংজ্ঞায়িত করার অধিকার” দেয়। এটি দ্বীন ও ইবাদত নয়, বরং আত্ম-উদ্ভাবিত ভ্রান্ত দর্শন।

৭. উপসংহার ও দর্শনীয় সারমর্ম:

কুরআন ও সুন্নাহ উভয়ই ওহী; একটিকে মানা আর অন্যটিকে অস্বীকার করার অর্থ হলো ‘সত্যের অর্ধেক গ্রহণ ও অর্ধেক প্রত্যাখ্যান’।

যদি কোন মতবাদ যুক্তির আকর্ষণ দিয়ে শুধু কুরআন নামক ওহী গ্রহণ করে এবং সুন্নাহ ও হাদীস নামক ওহী প্রত্যাখান করে, তবে তারা রয়েছে গভীর আত্মবিরোধিতায়।

ইসলামী আইন, নীতি, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের পূর্ণতা আসে কেবল তখনই, যখন ওহীর উভয় ধারা, মাতলু (কুরআন) ও গায়র মাতলু (সুন্নাহ-হাদীস)—কে সমন্বিতভাবে গ্রহণ করা হয়।

মূল কথা: “যে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করে, সে সঠিক পথে চলে; আর যে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে প্রকৃতই পথভ্রষ্ট।” (সূরা আল-আহযাব ৩৬)!

আল্লাহ-হুম্মা সাল্লি, ওয়া সাল্লিম, ওয়া বারিক আ’লা মুহাম্মাদ; আল-হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামীন। (মূসা: ২০-১০-২৫)

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

“ওহী গায়র মাতলু” অস্বীকারকারীদের অবস্থান: আইন, নীতি ও দর্শনের আলোকে বিশ্লেষণ

আপডেট সময় : ১১:০৯:২৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২০ অক্টোবর ২০২৫

ড. গোলাম মোস্তফা মূসা: একজন কুরআনিষ্ট (আহলে কুরআন) ভাই প্রশ্ন করেছেন: কুরআন হলো আল্লাহর “আহসানুল হাদীস” অর্থাৎ উত্তম হাদীস (৩৯:২৩)। কুরআন নামক এই উত্তম হাদীস থাকতে কেন আমাদেরকে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর হাদীস ও সুন্নাহ মানতে হবে?

প্রাকটিক্যাল অ্যাপলিকেশন: দ্বিতীয় প্রকার ওহী (ওহী গায়র মাতলু), অর্থাৎ হাদীস ও সুন্নাহ অস্বীকারকারী গোষ্ঠী (কুরআনিষ্ট বা আহলে কুরআন), তাদের চিন্তা, বিশ্বাস ও অবস্থানের উপর আইন, নীতি, নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও দর্শনের আলোকে একটি বিশ্লেষণ:

১. মূল দর্শন: ‘ওহী গায়র মাতলু’ মানে আল্লাহর ব্যাখ্যামূলক নির্দেশ

কুরআন নিজেই ঘোষণা করে যে, নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) কেবল কুরআন পাঠ করেই থেমে যাননি; তিনি তা ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ ও বাস্তব শিক্ষা দিয়েছেন। “আমি তোমার প্রতি এই যিকির (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি, যাতে তুমি মানুষকে ব্যাখ্যা করে দাও যা তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে।” (সূরা আন-নাহল ১৬:৪৪)!

নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) কুরআনের এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেছেন আল্লাহর নিকট থেকে; আল্লাহ বলেন, “অতঃপর আমাদের দায়িত্ব হলো (এই কুরআন) বর্ণনা ও ব্যখ্যা করে দেওয়া (সূরা ক্বিয়ামাহ, ৭৫:১৯)!

অর্থাৎ, ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের নির্দেশও ওহীর অংশ। অতএব, যারা শুধু প্রথম প্রকার ওহী (কুরআন) গ্রহণ করে কিন্তু দ্বিতীয় প্রকার ওহী (হাদীস-সুন্নাহ) অস্বীকার করে, তারা প্রকৃতপক্ষে কুরআনেরই একটি মৌলিক নির্দেশ অস্বীকার করছে।

২. আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ:

(ক) ইসলামী শরীয়ত কেবল কুরআনভিত্তিক নয়; বরং কুরআন ও সুন্নাহ উভয়ই আইন প্রণয়নের উৎস।

“তোমরা যদি কোনো বিষয়ে মতবিরোধে পড়ো, তবে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরে যাও।” (সূরা আন-নিসা ৪:৫৯)!

এখানে মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে ‘কুরআন’ এবং রাসূলের পক্ষ থেকে তাঁর ‘সুন্নাহ ও হাদীস’কে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। অতএব, আইনগতভাবে সুন্নাহ-হাদীস অস্বীকার করা মানে শরীয়তের একটি উৎস অস্বীকার করা, যা ইসলামী আইনভিত্তিক রাষ্ট্রে আকীদাগত অপরাধ (ইলহাদ বা বিদ’আদ) হিসেবে গণ্য।

(খ) ইসলামী ফিকহ ও শরিয়াহ-নীতির দৃষ্টিতে “ওহী গায়র মাতলু” ছাড়া সালাত, সিয়াম, যাকাত, হজ্জ, মিরাস, বিবাহ, তালাক, ওয়ারিশ ইত্যাদি বিষয়ের সুনির্দিষ্ট বিধান নির্ধারণই সম্ভব নয়। অতএব, কুরআনিস্টরা কার্যত শরিয়াহের বিধানহীন সমাজের দাবিদার, যা একটি আইনশূন্যতা ও নৈতিক বিশৃঙ্খলার দৃষ্টান্ত।

৩. নীতিশাস্ত্র ও নৈতিকতার আলোকে বিশ্লেষণ:

(ক) যারা দাবি করে: “কুরআনই যথেষ্ট।” কিন্তু নৈতিকভাবে, তারা আল্লাহর প্রেরিত রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর শিক্ষাকে অগ্রাহ্য করছে, যা এক ধরনের অবাধ্যতা (Insubordination)। আল্লাহ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি আনুগত্য কুরআনেই বাধ্যতামূলক করেছেন: “যে রাসূলের আনুগত্য করে, সে আল্লাহরই আনুগত্য করে।” (সূরা আন-নিসা ৪:৮০)!

(খ) তাই নৈতিক দিক থেকে হাদীস ও সুন্নাহ অস্বীকার করা মানে নবীর কর্তৃত্বকে অস্বীকার করা, আর তা আল্লাহর কর্তৃত্বকেই চ্যালেঞ্জ করা।
এটি এমন যেন কেউ বলে, “সংবিধান আমি মানি, কিন্তু আদালতের ব্যাখ্যা মানি না।”
একইভাবে, কুরআনিস্টরা কুরআন মানলেও তার ব্যাখ্যা ও বাস্তব প্রয়োগকে প্রত্যাখ্যান করে নিজেদেরই যুক্তিবাদে ফাঁদে পড়ে।

৪. মূল্যবোধের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ:

(ক) ইসলামিক মূল্যবোধের অন্যতম মূল স্তম্ভ হলো তাওহীদ, রিসালাত, আখিরাত; এই তিন স্তম্ভ ছাড়া ইসলাম অসম্পূর্ণ।
রিসালাত মানে নবুয়তের উপর বিশ্বাস এবং নবীর কথাবার্তা, কাজ ও কর্মপন্থা (সুন্নাহ-হাদীস) মানা সেই বিশ্বাসেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ।

(খ) ইসলামী বর্হিভূত কিছু ভ্রান্ত মতবাদ সমাজে ধর্মীয় বৈচিত্র্যের ছদ্মবেশে নৈতিক শূন্যতা তৈরি করছে। কারণ, যখন মানুষ নিজেই নিজের যুক্তি অনুযায়ী কুরআনের ব্যাখ্যা করবে, রিসালাতকে অস্বীকার করবে, তখন নৈতিক মানদণ্ড হবে “যে যার মতো কুরআন বোঝ”, ফলে ফলাফল হবে অরাজকতা, বিভাজন ও মূল্যবোধের পতন।

৫. দর্শনের আলোকে বিশ্লেষণ:

(ক) দার্শনিকভাবে ওহী (কুরআন) মানে “আল্লাহর জ্ঞান যা মানুষের জ্ঞানের বাইরে।” অতএব, ওহীর (কুরআনের) ব্যাখ্যা তথা সুন্নাহ-হাদীস মানবচিন্তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করে; এটি একটি “দিব্য জ্ঞানতত্ত্ব Epistemology”; আল্লাহর জ্ঞানের দর্শন।

(খ) যারা সুন্নাহ-হাদীস অস্বীকার করে, তারা মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত “ওহীর দর্শন”কে মানববুদ্ধিতে সীমাবদ্ধ করে। এটি Rational Reductionism, অর্থাৎ আল্লাহ প্রদত্ত সত্যকে যুক্তি ও ভুল ব্যাখ্যায় বন্দি করা। ফলে তারা “আল-হক” (সত্য) থেকে দূরে সরে গিয়ে “আল-জান্নাতুল মাউহূমাহ” (কল্পিত জান্নাত বা মায়াবী সুখের স্বর্গ)-এর জগতে প্রবেশ করে।

৬. বাস্তব ও সামাজিক প্রয়োগ (Real-world implication):

(ক) যদি হাদীসকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র কুরআন দ্বারা সমাজ পরিচালনা করা হয়, তাহলে: সালাত কেমন হবে কেউ জানবে না। যাকাতের পরিমাণ নির্ধারণ অসম্ভব হবে। হজ্জ, বিয়ে, তালাক, উত্তরাধিকার সবই ব্যাখ্যাহীন হয়ে পড়বে।

(খ) বাস্তব সমাজে এমন চিন্তা ধর্মনিরপেক্ষতার চেয়েও বিপজ্জনক, কারণ এটি “আল্লাহর বাণীকে নিজের মতো করে সংজ্ঞায়িত করার অধিকার” দেয়। এটি দ্বীন ও ইবাদত নয়, বরং আত্ম-উদ্ভাবিত ভ্রান্ত দর্শন।

৭. উপসংহার ও দর্শনীয় সারমর্ম:

কুরআন ও সুন্নাহ উভয়ই ওহী; একটিকে মানা আর অন্যটিকে অস্বীকার করার অর্থ হলো ‘সত্যের অর্ধেক গ্রহণ ও অর্ধেক প্রত্যাখ্যান’।

যদি কোন মতবাদ যুক্তির আকর্ষণ দিয়ে শুধু কুরআন নামক ওহী গ্রহণ করে এবং সুন্নাহ ও হাদীস নামক ওহী প্রত্যাখান করে, তবে তারা রয়েছে গভীর আত্মবিরোধিতায়।

ইসলামী আইন, নীতি, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের পূর্ণতা আসে কেবল তখনই, যখন ওহীর উভয় ধারা, মাতলু (কুরআন) ও গায়র মাতলু (সুন্নাহ-হাদীস)—কে সমন্বিতভাবে গ্রহণ করা হয়।

মূল কথা: “যে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করে, সে সঠিক পথে চলে; আর যে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে প্রকৃতই পথভ্রষ্ট।” (সূরা আল-আহযাব ৩৬)!

আল্লাহ-হুম্মা সাল্লি, ওয়া সাল্লিম, ওয়া বারিক আ’লা মুহাম্মাদ; আল-হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামীন। (মূসা: ২০-১০-২৫)