বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, বিএনপি ছেড়ে জামায়াতে যোগ দেওয়ার ক্ষোভে সরকার বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করেছে। তিনি বলেন, একজন সিনিয়র সিটিজেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য হিসেবে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও অদক্ষতা নিয়ে কথা বলতে পারেন। প্রয়োজনে অপদার্থ, ব্যর্থ ও অদক্ষ কর্মকর্তাদের শাসাতেও পারেন। কিন্তু সরকার বিমানবন্দরের ওই ঘটনাকে ইস্যু করে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়ে মূলত রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরীর উদ্যোগে শনিবার (৩ অক্টোবর) দুপুরে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং রিমান্ডের আদেশ বাতিল করে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করে বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান আবারও বীরত্বের সাহসিকতা দেখিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন রেখে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘আপনার পিতা-মাতা জামায়াত-শিবিরকে নিয়ে যেসব কথা বলেননি; আপনি সেসব কথা বলে নিজেকে কি পিতা-মাতার চেয়ে বেশি বিচক্ষণ মনে করেন?’ জামায়াত-শিবিরকে গুপ্ত বলার আগে নিজের এবং নিজেদের চেহারা আয়নায় দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার ঘোষিত কর্মসূচিতে বিএনপির নেতারা লুকিয়ে থাকলেও জামায়াত-শিবির রাজপথে জীবন দিয়েছিল। রাজপথের কর্মসূচিতে বিএনপি নেতাদের পাওয়া যেত না। অনেকে মোবাইল পর্যন্ত বন্ধ রাখতেন।
কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পর সরকার প্রধানসহ তার মন্ত্রীদের কেউ কেউ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে গুপ্ত এবং স্বাধীনতাবিরোধী বলছেন। তিনি বলেন, যাদের সঙ্গে আপনার মা (বেগম খালেদা জিয়া) জোট করেছিলেন, যাদের সমর্থনে আপনার মা সরকার গঠন করেছিলেন, তাদেরকে গুপ্ত ও স্বাধীনতাবিরোধী বলে প্রধানমন্ত্রী নিজেই তার মায়ের বিরুদ্ধে কথা বলছেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, পাকিস্তানের পক্ষে ভূমিকা রাখা শাহ আজিজুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, আব্দুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতি ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আব্বা মির্জা রুহুল আমিন রাজাকার ছিলেন। তাদেরকে আপনারাই রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, এমপি-মন্ত্রী বানিয়েছেন। জামায়াতকে স্বাধীনতাবিরোধী আর গুপ্ত বলার আগে বিএনপিকে আয়নায় নিজের চেহারা দেখার আহ্বান জানান তিনি।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের নয়, বরং সরকারের তলে-তলে যোগাযোগ ও সখ্যতা রয়েছে বলেই আওয়ামী লীগ রাজপথে মিছিলের সুযোগ পাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পলাতক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যের জন্য সরকার এগিয়ে এলে বিরোধীদল সহযোগিতা করবে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের সভাপতিত্বে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ সমাবেশে সংগঠনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি বলেন, সরকার বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের হাতে হাতকড়া পরিয়ে এ দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে হাতকড়া পরিয়েছে। আখতারুজ্জামানকে রিমান্ডে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধকে অসম্মান করেছে।
তিনি আরও বলেন, হাতকড়া পরানোর কথা ছিল বিএনপি নেত্রী মিষ্টির, রিমান্ডে নেওয়ার কথা ছিল মিষ্টি ও তার অনুসারী দখলবাজ সন্ত্রাসীদের। যারা চাঁদাবাজি ও দখলবাজি করছে, তাদের গ্রেপ্তার না করে অন্যায়, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের ওপর বিএনপি সরকারের রাগ কোথায়, সেটা আমরা জানি। বিএনপি সরকারের রাগ হচ্ছে, আখতারুজ্জামান কেন বিএনপি ছেড়ে ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়েছেন।
ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি কামাল হোসেন এমপি বলেন, জাতীয় সংসদের ৩৪ জন এমপি বিমানবন্দরে আসলেও বিমান কর্তৃপক্ষ সংসদ সদস্যদের কোনো প্রটোকল দেয়নি। বরং হয়রানি করেছে।
তিনি আরও বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান কেবল প্রবাসীদের হয়রানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন, তিনি কোনো অপরাধ করেননি। যার সাক্ষী তিনি নিজে। বিমানমন্ত্রীর বক্তব্য অসত্য এবং বাস্তবতার পরিপন্থি উল্লেখ করে তিনি বিমানমন্ত্রীকে অসত্য বক্তব্যের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান।
ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, ‘তারেক রহমানের সরকার নব্য ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠেছে।’ সরকারের দায়িত্ব ছিল মানুষের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু সরকার সেটি করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, বিমানবন্দরে প্রবাসীদের হয়রানির চিত্র প্রমাণ করে বিএনপি সরকার প্রবাসীবিরোধী সরকার। বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানির প্রতিবাদ করায় বিএনপি সরকার তাকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে পাঠিয়েছে। অনতিবিলম্বে বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে মুক্তি দিয়ে বিমানবন্দরের বিদ্যমান সমস্যা সমাধান এবং প্রবাসীদের হয়রানি বন্ধ করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিমের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা ইয়াছিন আরাফাত।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি ড. আব্দুল মান্নান, মহানগরী দক্ষিণের কর্মপরিষদ সদস্য হাফেজ রাশেদুল ইসলাম এমপি, অ্যাডভোকেট এস এম কামাল উদ্দিন, ড. মোবারক হোসাইনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।
সভাপতির বক্তব্যে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, ‘এই সরকার হাসিনারও আব্বা হয়ে গেছে। সরকার সমালোচনা সহ্য করতে পারে না। সরকারের বিরুদ্ধে কথা বললে স্কুল থেকে শিক্ষককে তুলে আনার ঘটনাও এই সরকার ঘটিয়েছে।’
তিনি বলেন, জামায়াতকে নিয়ে অপরাজনীতি করতে গিয়ে এরশাদের সলিল সমাধি হয়েছে, আওয়ামী লীগকে দিল্লি গিয়ে পালাতে হয়েছে। নতুন করে আবার কেউ অপরাজনীতির চেষ্টা করলে তাদের পরিণতি আরও ভয়াবহ হবে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়ে সরকার মূলত বার্তা দিতে চাচ্ছে, সরকারের দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে পারবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সমাবেশ শেষে বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ ও অবিলম্বে মুক্তির দাবিতে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি বায়তুল মোকাররম উত্তর গেট থেকে শুরু হয়ে পল্টন মোড়, প্রেসক্লাব হয়ে মৎস্য ভবন মোড়ে গিয়ে শেষ হয়।















