জাতীয় ডেস্ক: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন রোজার মাসেই বসতে পারে বলে জানা গেছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর দ্রুত সরকার গঠন, সংসদ সদস্যদের শপথ এবং নতুন মন্ত্রিসভার দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল হলেও সংসদের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর মুখে দেখা দিয়েছে সাংবিধানিক জটিলতা। প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন কে- এই প্রশ্নই এখন আলোচনার কেন্দ্রে। স্পিকার পদত্যাগ করে আত্মগোপনে রয়েছেন, আর ডেপুটি স্পিকার কারান্তরীণ। ফলে সভাপতিত্বের প্রশ্নে তৈরি হয়েছে কার্যত এক সাংবিধানিক শূন্যতা। এমন পরিস্থিতিতে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ চাইতে পারেন কি না, তা নিয়েও চলছে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ। একই সাথে উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে রাজনৈতিক টানাপড়েন থাকলেও একটি বিষয়ে স্পষ্ট- যে পদ্ধতিতেই গঠন হোক, দ্বিকক্ষের উভয় কক্ষেই বিরোধী দলের জন্য ডেপুটি স্পিকারের পদ সংরক্ষিত থাকবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল রাতে জানিয়েছেন যে, ১০-১২ মার্চের মধ্যে ত্রয়োদশ সংসদের অধিবেশন বসছে। তবে কে সভাপতিত্ব করবেন সে বিষয়ে কিছু বলেননি তিনি।
সংবিধানের ৭২(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের প্রথম বৈঠক আহ্বান করতে হবে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের গেজেট প্রকাশ করা হয়। সে হিসাবে আগামী ১৩ মার্চের মধ্যেই সংসদ অধিবেশন বসা বাধ্যতামূলক। সংবিধানের ৭২(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদ আহ্বান, স্থগিত ও ভঙ্গ করেন এবং প্রথম বৈঠকের সময় ও স্থান নির্ধারণ করেন- তবে তা প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শক্রমে। সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে অধিবেশন আহ্বানের পরামর্শ দিতে পারেন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদের প্রথম বৈঠকেই সদস্যদের মধ্য থেকে একজন স্পিকার ও একজন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করতে হবে। ৭২(৬) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, নতুন স্পিকার দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত পূর্ববর্তী স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার বহাল থাকবেন। অতীতে সেই ধারাবাহিকতায় বিদায়ী স্পিকারই প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করতেন এবং নতুন স্পিকার নির্বাচনের পর দায়িত্ব হস্তান্তর হতো। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী আত্মগোপনে থেকে পদত্যাগ করেছেন এবং ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু কারান্তরীণ আছেন। ফলে কার্যত দুই পদই শূন্য।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে- প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন কে? সংবিধানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই যে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার উভয় পদ শূন্য থাকলে কী হবে। তবে ১৯৭৪ সালে গৃহীত জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ৫(১) ধারায় বলা হয়েছে, স্পিকার নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি একজনকে মনোনীত করতে পারেন, যিনি সদস্যদের শপথ ও অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিধানই বর্তমান সাংবিধানিক শূন্যতা পূরণের পথ দেখাতে পারে। বিকল্প হিসেবে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের কাছে পরামর্শ চাইতে পারেন, যাতে ভবিষ্যতে কোনো বিতর্কের অবকাশ না থাকে।
সংসদীয় রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. কে এম মহিউদ্দিন মনে করেন, অতীতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি বলেই সংবিধানে নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নেই। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতি একটি ব্যতিক্রমী অবস্থা সৃষ্টি করেছে। তার মতে, কার্যপ্রণালী বিধির আলোকে রাষ্ট্রপতির মনোনয়নই তাৎক্ষণিক সমাধান হতে পারে; তবে সুপ্রিম কোর্টের মতামত নিলে সিদ্ধান্তটি অধিকতর সাংবিধানিক ভিত্তি পাবে।
এদিকে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন সম্পন্ন করে সংসদকে পূর্ণাঙ্গ করার প্রস্তুতিও চলছে। বর্তমান সংসদে বিএনপির সদস্য সংখ্যা ২০৮ (একটি আসন শূন্য)। আইন অনুযায়ী সাধারণ আসনের আনুপাতিক হারে নারী আসন নির্ধারিত হয়- প্রতি ছয়জন সাধারণ সদস্যের বিপরীতে একজন সংরক্ষিত নারী সদস্য। সে হিসাবে বিএনপির প্রাপ্য ৩৫টি নারী আসন; জোটগত সমর্থন পেলে তা ৩৬-এ উন্নীত হতে পারে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পাওয়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসনের বিপরীতে ১১টি নারী আসন পাবে। এ ছাড়া এনসিপি ও স্বতন্ত্র সদস্যদের মধ্যেও একটি করে নারী আসন যেতে পারে।
সূত্র জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহেই সংরক্ষিত নারী আসনের তফসিল ঘোষণা হতে পারে। যেহেতু এ আসনে সরাসরি ভোট হয় না এবং নির্বাচিত সংসদ সদস্যরাই ভোটার, তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তফসিল ঘোষণার দুই সপ্তাহের মধ্যেই সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যরা নির্বাচিত হতে পারেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রথম অধিবেশনের কার্যসূচিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি উদ্বোধনী ভাষণ দেবেন, যার ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব ও আলোচনা হবে। স্পিকার নির্বাচনের পর বিরোধীদলীয় নেতা ও উপনেতার নাম আনুষ্ঠানিকভাবে গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে। ৬৮টি আসন নিয়ে জামায়াতে ইসলামী এককভাবে বড় বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে; তাদের মনোনীত নেতা ও উপনেতা অধিবেশন বসলেই স্বীকৃতি পাবেন। পাশাপাশি প্রশ্নোত্তর পর্ব চালু, অর্ডার অব বিজনেস অনুমোদন, নির্বাচন-পূর্ব জারি করা অধ্যাদেশ পাস এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটি-যেমন পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি ও এস্টিমেটস কমিটি-গঠনের প্রক্রিয়াও শুরু হতে পারে।
আসন অনুপাতে স্থায়ী কমিটির সভাপতিও পাবে বিরোধী দল : শুধু তাই নয়, জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব কমিটি, প্রিভিলেজ কমিটি, অনুমিত হিসাব কমিটি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতি পদে বিরোধীদলীয় সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া, জাতীয় সংসদে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে সংসদে আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দলের মধ্য থেকে নির্বাচন করা হবে বলে জুলাই সনদের ২৪ নম্বরে উল্লেখ আছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ৩০টি রাজনৈতিক দল এতে একমত পোষণ করেছে।





















