সোমবার, ২৮ নভেম্বর ২০২২, ০৫:৫৮ অপরাহ্ন

নগরায়নের নয়া মহামারি ‘শব্দদূষণ’ রোধের দাবি তরুণদের

রিপোর্টারের নাম
  • সময় : রবিবার, ২ অক্টোবর, ২০২২
  • ৪২৮ দেখেছেন

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি: নির্মল বায়ুর শহর রাজশাহীসহ দেশেজুড়ে নগরায়নের নয়া মহামারি ও নীরব ঘাতক শব্দদূষণ রোধে প্রয়োজনীয় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও “শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রন) বিধিমালা, ২০০৬”র বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন তরুণরা। আজ রোববার (০২ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১১টায় রাজশাহীর সাহেববাজার জিরোপয়েন্টে রাজশাহীর উন্নয়ন গবেষণাধর্মী তরুণ সংগঠন ইয়ুথ এ্যাকশন ফর সোস্যাল চেঞ্জ-ইয়্যাস, সামজিক সংগঠন এলিজ্যাবল ইয়ুথ ফর ইভোলিউশন-আই এবং স্বপ্নচারী যুব উন্নয়ন সংস্থা যৌথভাবে এ দাবিতে ঘন্টাব্যাপী মানববন্ধন কর্মসূচি পালন শেষে স্মারকলিপি প্রদান করেছেন।

ইয়ুথ এ্যাকশন ফর সোস্যাল চেঞ্জ-ইয়্যাসের সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান আতিকের সঞ্চালনা ও পরিচালনায় এবং সভাপতি মো. শামীউল আলীম শাওনের সভাপতিত্বে মানববন্ধন কর্মসূচিতে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন রাজশাহীর প্রবীন সংবাদিক বীর মুক্তিযোদ্ধা এ্যাড. মুস্তাফিজুর রহমান খান আলম। মানববন্ধনে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য দেন, আদিবাসী ছাত্র পরিষদ কেন্দীয় কমিটির সহ সভাপতি সাবিত্রী হেমব্রম, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের দপ্তর সম্পাদক সূভাষ চন্দ্র হেমব্রম, সামাজিক কল্যান সংস্থার নির্বাহী পরিচালক সম্রাট রায়হান, গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী গবেষক মো. শহিদুল ইসলাম প্রমূখ। মানববন্ধনে বিষয়ভিক্তিক বক্তব্য দেন, সামজিক সংগঠন এলিজ্যাবল ইয়ুথ ফর ইভোলিউশন-আই’র সভাপতি মো. গোলাম নবী রনি এবং স্বপ্নচারী যুব উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি রুবেল হোসেন মিন্টু।

প্রধান বক্তা এ্যাড. মুস্তাফিজুর রহমান খান আলম বলেন, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন শহরের সৌন্দর্য্য বর্ধনের মাধ্যমে দর্শনদারীতে এগিয়ে গিয়েছে তবে গুণ বিচারে পিছিয়ে রয়েছে। রাজশাহীতে শব্দদূষণ রোধে তরুণরা এগিয়ে এসেছে তারা সমাবেশ করছে এটাই বড় আশা জাগানিয়া বিষয়। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার, প্রশাসনের যেখানে ভূমিকা রাখা উচিৎ অথচ তারা নীরব ভূমিকা পালন করছেন। তরুণরা তাদের এ নীরবতাকে ভেঙ্গে দিতে কর্মসূচি পালন করছেন।

হাইড্রেলিক হর্ণ ব্যবহারের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমাদের দেশের আইনে যেখানে হাইড্রোলিক হর্ণের ব্যবহার নিষিদ্ধ। ঠিক সেই দেশেই হাইড্রোলিক হর্ণের যতেচ্ছা ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। বিদেশ থেকে এ নিষিদ্ধ হর্ণ আমাদানি করা এমনকি দেশেও উৎপাদিত হচ্ছে। যা পুরোপরি আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি এ নিষিদ্ধ হর্ণের ব্যবহার আমদানি ও উৎপাদন বন্ধের পাশাপাশি শব্দদূষণ বন্ধে কার্যকারী পদক্ষেপ গ্রহণের রাসিক মেয়র সহ স্থানীয় প্রশাসনের কাছে দাবি জানান।

বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী গবেষক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা চাই গ্রিন সিটি প্রকৃত পক্ষেই গ্রিন সিটি হয়ে গড়ে উঠুক। শুধু নামে নয় পুরুষ্কারে নয় আমরা চাই সত্যিকারের একটি গ্রিন সিটি। যার শব্দ দূষণ থাকবে না একই সঙ্গে সত্যিকারের সবুজায়ন দেখতে চাই।’

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ‘রাজশাহী শহরজুড়ে ব্যাটারি চালিত অটোরিক্সাসহ সকল ধরণের যানবাহণের সংখ্যা যেমন বেড়েছে ঠিক তেমনি ভাবে বেড়েছে শব্দদূষণের মাত্রাও। নীরব এলাকাগুলোতেও থেমে নেই শব্দদূষণ। এতে নগরীতে বসবাসকরীরা শারীরিকভাবে ক্ষতির সম্মূখিন হচ্ছেন। তাই অবিলম্বে নগরীতে ব্যাটারি চালিত অটোরিক্সাগুলোর হর্ণসহ সকল যানবাহনে ব্যবহৃত হাইডোলিক হর্ণ অপসারণ এবং চলাচলকারী ব্যাটারি চালিত অটোরিক্সার সংখ্যা নিয়ন্ত্রনে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগে অভিযান পরিচালনা করতে হবে।”

অতিরিক্ত শব্দের পরিবেশেও শিশুর জন্মগত ত্রুটি দেখা দিতে পারে বলে উল্লেখ করে বক্তারা আরো বলেন, “শব্দদূষণের স্বাস্থ্য ঝুঁকির তালিকা নেহাত ছোট নয়। যেমন- কানে কম শোনা, বধিরতা, হৃৎকম্প, হৃদরোগ, শিশুদের লেখাপড়ায় মনোযোগ কমে যাওয়া, মানসিক বিকাশ বিঘিœত হওয়া, খিটখিটে মেজাজ, পেটের আলসার, অনিদ্রা বা ইনসমনিয়া, মানসিক উত্তেজনা ও উদ্বিগ্নতা বা অ্যাংজাইটি, স্ট্রোক ইত্যাদি। কর্মজীবীদের ভেতরে কাজের দক্ষতা, মনোযোগ কমে যাওয়া ও সহজেই মেজাজ হারিয়ে ফেলার প্রবণতা দেখা যায়।”

মানববন্ধন কর্মসূচি শেষে রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশানার জিএসএম জাফরউল্লাহ এনডিসির মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর রাজশাহীসহ দেশেজুড়ে নগরায়নের নয়া মহামারি ও নীরব ঘাতক শব্দদূষণ রোধে এবং শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রন) বিধিমালা, ২০০৬ এর যুগোপোযোগী সংস্কার ও বাস্তবায়ন করা সহ ১৪ দফা দাবি সম্বলিত স্মারকলিপি প্রদান করেন। তরুণ সংগঠনের প্রতিনিধিরা ইয়ুথ এ্যাকশন ফর সোস্যাল চেঞ্জ-ইয়্যাসের সভাপতি মো. শামীউল আলীম শাওন, সামজিক সংগঠন এলিজ্যাবল ইয়ুথ ফর ইভোলিউশন-আই’র সভাপতি মো. গোলাম নবী রনি এবং স্বপ্নচারী যুব উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি রুবেল হোসেন মিন্টু স্বাক্ষরিত এ স্বারকলিপি রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশানারের কার্যালয়ে জমা দেন। এছাড়াও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র (প্রতিমন্ত্রী) এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, রাজশাহীর জেলা প্রশাসক আব্দুল জলিল এবং রাজশাহী মহানগর পুলিশের কমিশনার আবু কালাম সিদ্দিককে নির্মল বায়ুর শহর রাজশাহীতে নীরব ঘাতক শব্দদূষণ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ১৩ দফা দাবি সম্বলিত তিনটি পৃথক পৃথক স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে।

 

স্মারকলিপিতে উল্লেখিত দাবিসমূহ হলো :

(১) ‘শব্দদূষণ’ রোধে ‘শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬’র যুগোপোযোগী সংস্কার ও বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বিধিমালায় জেনারেটরের মানমাত্রা নির্ধারণ ও আতশবাজি নিষিদ্ধ সম্পর্কিত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা। ভ্রাম্যমাণ আদালত আইনে শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা অন্তর্ভুক্ত করা এবং প্রয়োজনে শব্দদূষণ রোধে পৃথক আইন প্রণয়ন করা।

(২) বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের আওতায় পরিবেশ ক্যাডার ও পরিবেশ পুলিশ নিয়োগ প্রদান করা।

(৩) বিধিমালা কর্তৃক সংজ্ঞায়িত জোনসমূহ (নীরব, আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প ও মিশ্র) চিহ্নিত ও অফিসিয়াল নোটিশ দিয়ে সংশ্লিষ্টদের অবগত করা। নীরব ও আবাসিক এলাকায় হর্ন বাজানো নিষেধ লেখাসহ সাইনবোর্ড স্থাপন করা এবং তা কার্যকর করতে পদক্ষেপ গ্রহণ করা। আবাসিক এলাকায় ইট ভাঙার মেশিন সহ উচ্চ শব্দ উৎপন্নকারী যন্ত্রের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা।

(৪) জাতীয় জরুরী সেবা ‘৯৯৯’-এ কল সার্ভিসের পাশাপাশি অনলাইনে ই-মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে দ- প্রদান নিশ্চিত করা।

(৫) গাড়ি চালকদের যথাসম্ভব হর্ণ কম বাজিয়ে অথবা না বাজিয়ে গাড়ি চালানোর ব্যাপারে উৎসাহিত করা। পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে বাংলাদেশ পুলিশ, সিটি কর্পোরেশন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় সরকার এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্য প্রশাসনিক দপ্তর ও স্থানীয় যুব সংগঠনের মধ্যে সমন্বয় সাধন করার মাধ্যমে ‘শব্দদূষণ’ রোধে পদক্ষেপ নেয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষ, জনপ্রতিনিধি, পেশাজীবী, প্রশাসন, ড্রাইভিং প্রতিষ্ঠান, বাস-ট্রাক মালিক সমিতি ও স্থানীয় যুব সংগঠনের সমন্বয়ে কমিউনিটিভিত্তিক  কমিটি করে শব্দদূষণ সংক্রান্ত সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা।

(৬) সরকারি ও বেসরকারি টেলিভিশন, ক্যাবল টিভি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রচারণা চালানো। ধূমপানের ক্ষতিকর দিকটি যেভাবে প্রচারণা করা হয়, সেভাবে সব নাটকের শুরুতে শব্দদূষণের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে প্রচারণা করা। টেলিভিশন, রেডিও, পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালগুলোতে তথ্যভিত্তিক রিপোর্ট ও প্রামাণ্যচিত্র বা অনুষ্ঠান প্রচার ও প্রকাশ করা।

(৭) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে শব্দদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জানানো। পাঠ্যসূচিতে শব্দদূষণের ক্ষতিকর দিক ও সচেতনতামূলক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা।

(৮) হাইড্রোলিক হর্ন আমদানি বন্ধ করার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন বন্ধ নিশ্চিত করা ।

(৯) অযথায় হর্ন বিশেষত হাইড্রোলিক হর্ন ও সাইরেন বাজানোর শাস্তি বৃদ্ধি করার পাশাপাশি তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

(১০) চালকদের শব্দ সচেতনতা যাচাই করে লাইসেন্স প্রদান করা ও শব্দের মাত্রা অনুযায়ী যানবাহনের ছাড়পত্র প্রদান এবং তা নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করা। গাড়ির হর্ন বন্ধে যৌথ অভিযান বা ভ্রাম্যমাণ আদালত বসানো।

(১১) শব্দের মাত্রা হ্রাসের পদক্ষেপ গ্রহণ ছাড়া নির্মাণ প্রকল্প ও শিল্প-কারখানা স্থাপনে ছাড়পত্র প্রদান করা যাবেনা। উচ্চ শব্দ এলাকায় ইয়ার মাফসহ ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীর ব্যবহার নিশ্চিত করা।

(১২) ছাদ, বারান্দা, খোলা জায়গায় বেশি বেশি গাছ লাগানো (গাছ শব্দ শোষণ করে) ও সড়কের পাশে গাছ লাগিয়ে সবুজ বেষ্টনী তৈরি করতে হবে।

(১৩) সন্ধ্যার পর ছাদ ও কমিউনিটি হলে, আবাসিক এলাকায় গান-বাজনা, ব্লেন্ডার, প্রেশার কুকার, ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, ড্রিল ও গ্রাইন্ডিং মেশিন এর ব্যবহার সীমিত করা।

(১৪) অনুমতি ব্যতীত সভা-সমিতি ও সামাজিক অনুষ্ঠান, নির্বাচনী প্রচারণা মিছিল এবং বিজ্ঞাপনের কাজে মাইকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা। মাত্রাতিরিক্ত শব্দে যেন কেউ গান না বাজায়, সেজন্য সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা। বর্ষবরণসহ সবধরণের অনুষ্ঠানে সকল প্রকারের আতশবাজি ও ফানুসের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা।

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার.....

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর.....